রফিকুল ইসলাম রাজু
চট্টগ্রাম
বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), লালদিয়ার চর এবং ঢাকার
কেরানীগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনাল ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া
হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ।
রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে এ
ঘোষণা আসার পর বিষয়টি
নিয়ে শুরু হয়েছে দেশজুড়ে
বিতর্ক।
নৌ
সচিবের ভাষ্যমতে, বন্দর কার্যক্রম আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানে
উন্নীত করতে সরকার বেসরকারি
ও বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ত করছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে
প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে
মূল যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হলেও,
একে “কৌশলগত জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া”
বলে সমালোচনা করছে একাধিক পক্ষ।
বিদেশিদের
হাতে কৌশলগত টার্মিনাল, বাড়ছে উদ্বেগ
নিউমুরিং
কন্টেইনার টার্মিনাল, লালদিয়ার চর এবং পানগাঁও
টার্মিনাল—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ
বন্দর স্থাপনা কেবল দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং কৌশলগত
নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। এইসব টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা
ও নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে গেলে,
সেখানে দেশের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা অনেকটা সীমিত হয়ে যাবে বলে
আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের
মতে, আধুনিকায়নের নামে দেশের অবকাঠামো
বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া
একটি দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি করছে। এটি
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়, বরং সার্বভৌমত্বকেও
ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিগত
সরকার যেখানে আত্মনির্ভরতা দেখিয়েছিল
বিশ্লেষকরা
বলছেন, বিগত সরকার চট্টগ্রাম
ও মংলা বন্দরসহ দেশের
অন্যান্য স্থানে বড় অবকাঠামো নির্মাণে
নিজেদের দক্ষতা, দেশীয় জনবল ও অভ্যন্তরীণ
সম্পদ ব্যবহারেই এগিয়ে গিয়েছিল। যেমন—চট্টগ্রাম বন্দরের
বে-টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ ও ডিজাইন পুরোপুরি
দেশীয় পরিচালনায় পরিচালিত হয়। পানগাঁও টার্মিনাল
তৈরি হয়েছিল দেশের অর্থায়নে এবং দেশীয় নিয়ন্ত্রণেই
তার কার্যক্রম শুরু হয়।
সেই
তুলনায় বর্তমান সরকার অতি সহজেই বিদেশি
অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে
পড়েছে। দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর চেয়ে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানদের হাতে দায় সঁপে
দেওয়া যেন নীতিগত অবস্থান
হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের
ব্যাখ্যা: আধুনিকায়ন ও গতি আনতে
বিদেশি অংশগ্রহণ জরুরি
নৌ
সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ জানিয়েছেন, বিদেশি অপারেটরদের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা
ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরের
সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম
বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চাপে বন্দর কার্যক্রমে
ধীরগতি তৈরি হচ্ছে। এই
অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে
উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও আধুনিক
অবকাঠামো জরুরি।
সরকার মনে করছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এতটা সক্ষম নয় যে, তারা এইসব কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারবে। তাই বিদেশিদের সম্পৃক্ত করে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনাই এখন সরকারের লক্ষ্য।
https://youtu.be/nQ524dA-INM?si=oDVmm-ocnIriMMFW
“উন্নয়ন
নয়, আত্মসমর্পণ”—সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া
তবে
এই যুক্তিকে সহজভাবে নিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতি অধ্যাপক ড. নাজমুল হক
বলেন, “একটা বন্দর শুধু
পণ্য ওঠানামার স্থান নয়, এটা কৌশলগতভাবে
একটি দেশের গর্ব ও নিয়ন্ত্রণের
প্রতীক। যখন আপনি সেটা
বিদেশিদের হাতে তুলে দেন,
তখন উন্নয়নের নামে আপনি মূলত
নিয়ন্ত্রণ হারান। এটা উন্নয়ন নয়,
আত্মসমর্পণ।”
তাঁর
মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে
বিদেশিদের প্রবেশ মানে কেবল বাণিজ্যিক
লেনদেন নয়, বরং দেশের
সার্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা একটি অজানা ব্যবস্থার
হাতে সঁপে দেওয়া। তিনি
আরও বলেন, “বিগত সরকার যদি
নিজেদের জনবল দিয়ে, নিজেদের
সম্পদে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে
বর্তমান সরকার কেন পারবে না?
প্রশ্নটা এখানেই।”
চীন,
ভারত না অন্য কেউ?
সরকার
এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি যে, কোন বিদেশি
অপারেটর বা দেশ এই
টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পাবে। তবে বিভিন্ন সূত্রের
বরাত দিয়ে ধারণা করা
হচ্ছে, চীন ও ভারত—এই দুটি দেশই
টার্মিনাল হস্তান্তরের দৌড়ে আছে। এক্ষেত্রে
বিদেশি রাজনৈতিক প্রভাব বা ভূরাজনৈতিক চাপও
নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন
উঠছে।
বাংলাদেশের
মতো একটি কৌশলগত ভৌগোলিক
অবস্থানে থাকা দেশের জন্য
এই ধরনের অবকাঠামো অন্য কোনো দেশের
নিয়ন্ত্রণে যাওয়া কতটা নিরাপদ, তা
নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্ভাব্য
প্রভাব: কী হারাতে বসেছে
বাংলাদেশ?
বিশ্লেষকদের
মতে, বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে
একটি দেশ কেবল রাজস্ব
হারায় না, হারায় অর্থনৈতিক
স্বাধীনতাও। বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন সমস্যা সৃষ্টি
হতে পারে, যেমন—
• স্থানীয় কর্মসংস্থানে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ,
• অপারেশনে বৈদেশিক নীতির প্রভাব,
• জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি,
• আয়ের বড় অংশ
বিদেশে চলে যাওয়া।
অর্থনীতিবিদ
ফারুক আহমেদ বলেন, “বিদেশি অপারেটররা যে প্রযুক্তি ও
দক্ষতা নিয়ে আসবে, তা
আমরা ট্রেনিং দিয়ে দেশীয় জনবলের
মাধ্যমেও অর্জন করতে পারি। কিন্তু
এখন মনে হচ্ছে, সরকার
সহজ পথ বেছে নিচ্ছে—নিজেদের শক্তি বাড়ানোর বদলে দায়িত্ব সরিয়ে
দিচ্ছে।”
বন্দর
ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না বিদেশ নির্ভরতা?
অনেকেই মনে করছেন, সমস্যার মূল জায়গা হচ্ছে বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অভাব। সরকারি প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা বাড়ানো, নীতি প্রণয়ন ও নজরদারিতে পরিবর্তন আনলেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আধুনিকায়ন সম্ভব। কিন্তু বর্তমান সরকার যেন সেই পথে হাঁটতে চাইছে না।
https://www.facebook.com/share/v/1FAsJoQaJL/
জাতীয়
সম্পদের প্রশ্নে নীরব সংসদ ও
রাজনৈতিক অঙ্গন
এই
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও বেশ নীরব। জাতীয়
সম্পদ হস্তান্তরের মতো একটি বিষয়ে
সংসদে তেমন কোনো আলোচনা
হয়নি। এমনকি বিরোধী দল থেকেও কার্যকর
প্রতিক্রিয়া আসেনি।
সাবেক
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, “এই ধরনের সিদ্ধান্ত
নেওয়ার আগে জাতীয় স্বার্থ,
নিরাপত্তা, আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ—সব দিক চিন্তা
করা দরকার। সরকারের উচিত ছিল জাতীয়
আলোচনার মাধ্যমে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া।”
চট্টগ্রাম, লালদিয়ার চর ও পানগাঁও টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে জাতীয় স্বার্থ হস্তান্তরের আশঙ্কা। বিগত সরকারের নীতিতে ছিল আত্মনির্ভরতা, যেখানে নিজস্ব দক্ষতা ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সরকারের নীতিতে বিদেশি নির্ভরতা ও কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি স্পষ্ট। জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে এখন প্রয়োজন জবাবদিহি, গণশুনানি এবং সর্বোপরি—জনগণের অংশগ্রহণ।
আকাশজমিন / আরআর