রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে
সরকারি প্লট বরাদ্দ নিয়ে
দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া তিনটি মামলায়
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট
২১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫
এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। ক্ষমতার
অপব্যবহার ও অযোগ্যতা থাকা
সত্ত্বেও বিশেষ সুবিধা নিয়ে পূর্বাচল আবাসন
প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে
১০ কাঠা করে প্লট
বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে তাকে ৩ মামলায়
৭ বছর করে মোট
২১ বছরের কারাদণ্ড এবং প্রতিটি মামলায়
এক লাখ টাকা করে
মোট তিন লাখ টাকা
অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অর্থদণ্ড
অনাদায়ে আরও ছয় মাস
করে মোট দেড় বছরের
সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ
ছাড়া একই মামলার ধারাবাহিকতায়
এক মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে
সজীব ওয়াজেদ জয়কে ৫ বছরের
সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ
টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অনাদায়ে তাকে আরও ছয়
মাস কারাভোগ করতে হবে। অন্য
এক মামলায় তার মেয়ে সায়মা
ওয়াজেদ পুতুলকেও ৫ বছরের সশ্রম
কারাদণ্ড ও এক লাখ
টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে; অর্থদণ্ড অনাদায়ে ছয় মাস অতিরিক্ত
কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
এদিন
আদালতে একমাত্র হাজির আসামি ছিলেন রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ
খুরশীদ আলম। তাকে রায়
ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত
করা হয় এবং সাজা
পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো
হয়। অন্য আসামিরা দীর্ঘদিন
ধরে পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
গত
রোববার মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি খুরশীদ আলমের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত
আজকের দিন রায় ঘোষণার
জন্য ঠিক করেন। অন্য
আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী যুক্তিতর্ক
পেশ করতে পারেননি এবং
তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও পাননি।
দুদক
জানায়, পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত
দুর্নীতির অভিযোগে গত জানুয়ারিতে পৃথক
ছয়টি মামলা করা হয়। এসব
মামলার আসামিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার
ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়,
মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল), বোন শেখ রেহানা,
রেহানার মেয়ে ও ব্রিটিশ
এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব
সিদ্দিক, অপর মেয়ে আজমিনা
সিদ্দিকসহ আরও অনেকে। পরে
মামলার তদন্ত শেষে তিনটি মামলা
বিশেষ জজ আদালত-৫
এ এবং তিনটি মামলা
বিশেষ জজ আদালত-৪
এ স্থানান্তর করা হয়। ৩১
জুলাই বিশেষ জজ আদালত-৫
তিন মামলায় অভিযোগ গঠন করেন, আর
বিশেষ জজ আদালত-৪
বাকি তিন মামলায় অভিযোগ
গঠন করেন।
রায়ে
বলা হয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার
অপব্যবহার করে অযোগ্য হলেও
শেখ হাসিনা ও তার পরিবার
পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে
১০ কাঠা করে প্লট
বরাদ্দ নিয়েছেন। এই অনিয়মকে ‘ক্ষমতার
বিশেষ সুবিধা গ্রহণ’ হিসেবে দেখা হয়। আদালত
মনে করেন, এসব প্লট বরাদ্দের
সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা
সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
দুদক
প্রসিকিউটর মইনুল হাসান রায় ঘোষণার পর
সাংবাদিকদের বলেন—শেখ হাসিনার
বিরুদ্ধে তিন মামলায় ৭
বছর করে মোট ২১
বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দুদক প্রত্যাশা করেছিল
প্রতিটি মামলায় সর্বোচ্চ সাজা—যা আজীবন
কারাদণ্ড। তাই দুদক উচ্চ
আদালতে আপিল করবে কি
না এ বিষয়ে আলোচনার
পর সিদ্ধান্ত হবে বলে তিনি
জানান। তিনি বলেন, “দোষী
প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ সাজা
না হওয়ায় আমরা এ রায়ে
অখুশি।”
মামলার
বাকি আসামিদের সাজা নিম্নরূপ:
প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন—২ মামলায় ৬
বছর করে মোট ১২
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা
করে মোট ২ লাখ
টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৬ মাস
করে এক বছরের কারাদণ্ড।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ—৩ মামলায় ৬
বছর করে মোট ১৮
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা
করে মোট ৩ লাখ
টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাস
করে দেড় বছরের কারাদণ্ড।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার—৩ মামলায় ৬
বছর করে মোট ১৮
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, মোট তিন লাখ
টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাস
করে দেড় বছরের কারাদণ্ড।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন—৩ মামলায় ৬
বছর করে মোট ১৮
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে দেড় বছরের কারাদণ্ড।
সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার—৩ মামলায় ১
বছর করে মোট ৩
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ২০ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড।
রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা—৩ মামলায় ৫
বছর করে মোট ১৫
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; দেড় লাখ টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে ৯ মাসের কারাদণ্ড।
রাজউকের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন—৩ মামলায় ৩
বছর করে মোট ৯
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ৬০ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড।
মেজর (ইঞ্জিনিয়ার) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.)—৩ মামলায় ৩
বছর করে মোট ৯
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ৬০ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড।
রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ—১ মামলায় ৩
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ২০ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে দুই মাস।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস—২ মামলায় ৩
বছর করে মোট ৬
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ৪০ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে ৪ মাসের কারাদণ্ড।
রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলাম—২ মামলায় ৩
বছর করে মোট ৬
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ৪০ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে ৪ মাস।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) মো. শফিউল হক—১ মামলায় ৩
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ২০ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে দুই মাস।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম—১ মামলায় ৩
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ২০ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে দুই মাস।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো. কামরুল ইসলাম—১ মামলায় ৩
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ২০ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে দুই মাস।
সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাফিজুর রহমান—১ মামলায় ১
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ৫ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে এক মাস।
সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাবিবুর রহমান সবুজ—১ মামলায় ১
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ৫ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে এক মাস।
সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) নায়েব আলী শরীফ—২ মামলায় ১
বছর করে মোট ২
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ১০ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে ২ মাস।
সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মাজহারুল ইসলাম—১ মামলায় ১
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ৫ হাজার টাকা
অর্থদণ্ড; অনাদায়ে এক মাস।
রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম—৩ মামলায় ১
বছর করে মোট ৩
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; মোট ১৫ হাজার
টাকা অর্থদণ্ড; অনাদায়ে তিন মাস।
মামলায়
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের
প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকারকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস
দিয়েছেন আদালত।