রফিকুল ইসলাম রাজু
বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে যখন বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশে এইচআইভি–এইডস পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে সামাজিক কলঙ্ক, অপরদিকে চিকিৎসা, সেবা এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা—এসব মিলিয়ে দেশটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রতিদিনের বাস্তবতা যেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য। তাদের গল্পে ফুটে উঠছে অবহেলা, বঞ্চনা এবং দুঃসহ সংগ্রামের চিত্র।
এমনই একজন ব্যক্তি কৃষ্ণা (ছদ্মনাম)। দেশের একটি সুপরিচিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি। প্রধানত ডাক্তারদের রিপোর্ট প্রস্তুত করতে সহায়তা করার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। বছরখানেক আগে তিনি আকস্মিক জানতে পারেন—তিনি মরণব্যাধি এইচআইভি এইডসে আক্রান্ত। রোগ শনাক্তের মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি চাকরি হারিয়েছেন, হারিয়েছেন জীবনের স্থিরতা এবং সামাজিক স্বীকৃতি। ৪৫ বছর বয়সে তিনি এখন নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে ঘরে বেকার বসে আছেন।
কৃষ্ণা জানান, তার রোগের ব্যাপারে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ, তার শাখার ম্যানেজার, স্থানীয় জেলা কমিশনার এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল। কিন্তু কেউই তার পাশে দাঁড়াননি। তিনি বলেন, “আমি শুধু একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছি, কিন্তু আচরণটা এমন হলো যেন আমি সমাজের জন্য হুমকি। আমার চাকরি চলে গেল, আর্থিক নিরাপত্তা শেষ, মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এখন আমি প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছি সমাজ থেকে।”
হাসপাতালের নাম প্রকাশ করতে চান না কৃষ্ণা। কারণ প্রতিষ্ঠানটি গত অক্টোবরে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তার চাকরির সম্পর্ক শেষ করেছে এবং এখন পর্যন্ত তার বেতন ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো; সহকর্মীরা দূরে থাকতেন। মানসিক চাপ, হতাশা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার ভারে তার জীবন আরও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণার অভিজ্ঞতা একক নয়—বাংলাদেশে এইচআইভি–পজিটিভ অধিকাংশ মানুষই একই রকম সামাজিক বঞ্চনার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিশ্বজুড়ে যখন এইচআইভি সংক্রমণ কমছে, বাংলাদেশে তখন সংক্রমণের হার কম হলেও ঝুঁকি বাড়ছে বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ইউএনএইডস-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৩ লাখ মানুষ নতুনভাবে এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়েছেন এবং ৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গেছেন এইডস–সম্পর্কিত জটিলতায়। অথচ বাংলাদেশে এখনও সংক্রমণ হার ০.১ শতাংশের নিচে। তবে বিশেষ জনগোষ্ঠী, যেমন ইনজেকশন নেশাকারী (পিডব্লিউআইডি), যৌনকর্মী, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়, পুরুষে পুরুষ যৌন সম্পর্ককারী এবং বিদেশফেরত প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
সামাজিক কলঙ্কের কারণে এইচআইভি আক্রান্ত অনেকেই পরীক্ষা করাতে চান না বা চিকিৎসা নেন না। ইউএনএইডস বলছে, বিশ্বের ৮৭ শতাংশ মানুষ জানেন তারা এইচআইভি পজিটিভ কি না; কিন্তু বাংলাদেশে এই হার অনেক কম। ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা—সব মিলিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে বিদেশফেরত শ্রমিকদের মধ্যে। তারা বিদেশে সংক্রমিত হয়ে দেশে ফিরে আসার পর নিয়মিত চিকিৎসা না নিলে পরিবার ও সমাজে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মীদের স্ত্রীদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী এইচআইভিতে আক্রান্তদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী ও কন্যা। বাংলাদেশে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন—নারীরা ক্রমেই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। কারণ তারা নিজেরা ঝুঁকি না নিলেও স্বামী বা সঙ্গীর আচরণের কারণে সংক্রমিত হচ্ছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একদল যুবক ‘চেমসেক্স’-এর (নেশার মাধ্যমে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওষুধ গ্রহণ করে যৌন আচরণ) কারণে সংক্রমিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন দেশের এইচআইভি বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “যুবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। তাদের অনেকেই পরীক্ষা করাতে রাজি হন না।”
চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক সেবায় বাংলাদেশ বড় সংকটে। বড় শহরের বাইরে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সহজলভ্য নয়। পুরুষদের মধ্যে চিকিৎসা নিতে অনীহা, শিশুদের চিকিৎসায় ফাঁক—এসব সমস্যা বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী ২০২৪ সালে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিশু এআরটি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “চিকিৎসা না নিলে এইচআইভি দ্রুত জটিল রূপ নেয় এবং অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে এআরটি গ্রহণে অনীহা রয়েছে সামাজিক কলঙ্ক, সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে।”
ইউএনএইডস-এর রিপোর্ট বলছে, বিশ্বব্যাপী ইনজেকশন নেশাকারীদের ৭.১%, সমকামী পুরুষদের ৭.৬% এবং ট্রান্সজেন্ডারদের ৮.৫% মানুষ এইচআইভি পজিটিভ। এই হার বিশ্বজনসংখ্যার সামগ্রিক ০.৭% হার থেকে অনেক বেশি। এসব বিশেষ জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা, সেবা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির আওতায় আনতে ব্যর্থ হলে সংক্রমণ বাড়বে।
অর্থায়নের সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক এইচআইভি তহবিল কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৭ বিলিয়ন ডলারে—যা প্রয়োজনের তুলনায় ১৭% কম। অর্থায়ন কমে গেলে বাংলাদেশসহ নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে বড় বাধা সৃষ্টি হবে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটিং মেকানিজম (বিসিসিএম) এবং পিএলএইচআইভি নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক মো. হাফিজুদ্দিন মুন্না বলেন, “বাংলাদেশে এইচআইভি সেবার মান সংকটাপন্ন। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন কমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম সীমিত করা হয়েছে। কমিউনিটির কাছ থেকে সেবা সরিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার ফলে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। এইচআইভি চিকিৎসা শুধু চিকিৎসা না—এতে মানসিক সহায়তাও প্রয়োজন। কিন্তু এর জন্য বিশেষায়িত কোনো বিভাগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “যদি এখনই উদ্যোগ না নেওয়া হয়, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা বাড়ানো, এআরটি সম্প্রসারণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সেবার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় তহবিল বাড়ানো ছাড়া বাংলাদেশে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।”