ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

টাঙ্গাইলে অবৈধ করাতকলে ধ্বংসের মুখে বনাঞ্চল


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ৯:৪১ পিএম

মোজাম্মেল হক, টাঙ্গাইল 

টাঙ্গাইলে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭৬ একর বনভুমি রয়েছে। এই বনাঞ্চল মধুপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, সখীপুর ও মির্জাপুর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই বনাঞ্চলকে ঘিরে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকাসহ সর্বমোট ৫৩৯টি করাতকল রয়েছে, যার মধ্যে অনুমোদন আছে ১৬৩টির, বাকী ৩৭৬টি করাতকল অবৈধ। এই করাতকলগুলোতে প্রতিদিন চিরানো হচ্ছে বনের বৃক্ষ, পাচার হচ্ছে কাঠ, ফলে বনাঞ্চল বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বনবিভাগ অনুমোদনহীন করাতকল মালিকদের জরিমানা করলেও থেমে নেই অবৈধ কাঠ চিরাই ও পাচার।

বনাঞ্চলসহ পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে বন ও পরিবেশ কমিটি। তবে এই কমিটির কার্যক্রম চলছে কেবল কাগজে-কলমে। সরেজমিনে দেখা গেছে, অবৈধ করাতকল স্থাপন করা হয়েছে কোথাও সামাজিক ও সংরক্ষিত বন ঘেঁষে আবার কোথাও বনের ভেতর। রেঞ্জ ও বিট অফিসের নাকের ডগায় করাতকল স্থাপন করে দিনরাত চলছে বৈধ ও অবৈধ কাঠ চিরাই। অবৈধভাবে সংরক্ষিত বন থেকে শাল-গজারি গাছ কেটে এসব করাতকলে চিরাই করলেই হয়ে যায় বৈধ। অথচ বন আইনে বলা আছে বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে করাতকল স্থাপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বন বিভাগের লোকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে করাতকল স্থাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বন থেকে শাল-গজারি বিলুপ্তির জন্য দায়ি হচ্ছে অবৈধ করাতকল।


করাতকলগুলো ঘুরে দেখা গেছে, মিল চালানোর ক্ষেত্রে বিধি-বিধান মানছেন না করাতকলের মালিকরা। অনেকেই ১০-১৫ বছর ধরে অনুমোদন ছাড়াই চালাচ্ছেন করাতকল। করাতকলের চত্বরে মজুত রাখছেন বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলছে কাঠ কাটার কাজ।

কোনো কোনো এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু করাতকল। এ কারণে শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব অবৈধ করাতকল থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। করাতকল থেকে স্থানীয় বন বিভাগ ২০০০-৫০০০ টাকা করে মাসিক চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

টাঙ্গাইল বন বিভাগের আওতাধীন বনাঞ্চলে মোট ৯টি রেঞ্জ রয়েছে। রেঞ্জগুলো হলো: টাঙ্গাইল সদর রেঞ্জ, ধলাপাড়া রেঞ্জ, হতেয়া রেঞ্জ, বহেড়াতলী রেঞ্জ, বাঁশতৈল রেঞ্জ, অরণখোলা রেঞ্জ, মধুপুর রেঞ্জ, দোখলা রেঞ্জ ও মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জ। এই ৯টি রেঞ্জের আওতায় ৩৪টি বিট, ৩টি সামাজিক বনায়ন নার্সারী ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৯টি উপজেলা সামাজিক বনায়ন কেন্দ্র রয়েছে।

মধুপুরে ৪৫ হাজার একর বনাঞ্চলের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার একর বৃক্ষশূন্য। আনারস, কলা, ড্রাগনসহ নানা কৃষি ফসলের খেতে পরিণত হয়েছে বনভূমি। বাকি ১০ হাজার একরও ক্ষয়িষ্ণু। মধুপুর উপজেলায় ৯০টি করাতকল রয়েছে, যার মধ্যে ৭৩টির লাইসেন্স নেই।

ঘাটাইলের ধলাপাড়া রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট করাতকল রয়েছে ৯০টি, যার মধ্যে নিবন্ধন নেই ৪৫টির। পৌরসভা এবং আশেপাশের এলাকায় মাত্র ১০টি করাতকলের নিবন্ধন রয়েছে। ঘাটাইলে সামাজিক ও সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ২৫ হাজার ৭১১ একর। এই ভূমি দেখভালের জন্য রয়েছে বন বিভাগের একটি রেঞ্জের আওতায় ছয়টি বিট অফিস।

উপজেলার সংগ্রামপুর ইউনিয়নের দেওজানা বাজার করাতকল মালিক ইদ্রিস আলী জানান, বনের ভিতর মিল চালানো অবৈধ, আমার মিলের কোনো কাজের কাগজপত্র নেই। বন বিভাগের লোকজন আসলে সামান্য খরচ দিয়ে চা খাওয়াইয়া বিদায় করি।

সংগ্রামপুর ইউনিয়নের মাষ্টার বাড়ী মোড় করাতকলের শ্রমিক বাবুল হোসেন বলেন, বন কর্মকর্তারা অভিযানে আসছিলেন, বিট অফিসার টাকা-পয়সা ভালোই খেয়েছে, তারপরও আমাদের হয়রানি করেছে।


অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে বলে দাবি করেন ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির হোসাইন। সম্প্রতি ছয়টি অবৈধ করাতকল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। সখীপুর উপজেলায় শতাধিকের বেশি করাতকল রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১২টির লাইসেন্স আছে। সম্প্রতি কয়েকজন লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছেন। এছাড়াও কালিহাতী ও মির্জাপুরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও লাইসেন্সবিহীন করাতকল রয়েছে। হরহামেশাই চিরানো হচ্ছে বিভিন্ন বনজ বৃক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক করাতকল মালিক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমাদের স মিল চলছে। আবেদন করেছি, কিন্তু এখনও অনুমোদন পাইনি।” তিনি বলেন, “বন বিভাগের লোকজনকে ম্যানেজ করে মিল চালাচ্ছি।” তাদের মাসিক কোনো চাঁদা নেই। জেলা থেকে কোন অভিযান আসলে এরা আগেই আমাদের জানিয়ে দেয়।

কাঠ ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, “আমরা কাঠের ব্যবসা করি। এই ব্যবসা করে আমাদের সংসারের খরচ চলে। মিলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আছে। মাঝেমধ্যে বন বিভাগের লোকজন এসে মিল থেকে টাকা নেয়, এতে মিল মালিকদের কোনো ঝামেলা হয় না।” একই ধরনের কথা বলেন কাঠ ব্যবসায়ী রফিক ও তৈয়ব মিয়া।

পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা’র বিভাগীয় সমন্বয়কারী গৌতম চন্দ্র চন্দ জানান, করাতকল বিধিমালা ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত, রক্ষিত ও সরকারি বনভূমির সীমানা থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন নিষিদ্ধ। এই বিধি লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানা করা হয়। তবে টাঙ্গাইলের বেশির ভাগ করাতকলই অবৈধ। এগুলো দ্রুত উচ্ছেদ ও মালামাল জব্দ না করলে বনাঞ্চল সম্পূর্ণ বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়বে এবং পরিবেশ ও প্রাণীবৈচিত্র ধ্বংস হবে।

টাঙ্গাইল বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, জেলায় ৫৩৯টি করাতকল রয়েছে, যার মধ্যে ১৬৩টিকে বিধি মোতাবেক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাকি করাতকলগুলো অবৈধ। এসব অবৈধ করাতকল জেলার ১২টি উপজেলায় অবস্থিত। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবৈধ করাতকলের তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসেই অবৈধ করাতকল উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং যৌথ বাহিনীসহ এই অভিযান পরিচালিত হয়। গত মাসে সাতটি অভিযান এবং চলতি মাসেও একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অবৈধ করাতকল উচ্ছেদের জন্য পর্যায়ক্রমে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আকাশজমিন / আরআর


এ সম্পর্কিত আরো খবর