দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ অ্যান্ড ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুর কারণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০১ জনে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান এ বছর দেশে পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই প্রতিফলিত করছে।
গত এক দিনে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ৪২১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এতে চলতি বছরে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৭০৫ জনে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ইতোমধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯৬ হাজার ৭৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। বর্তমান সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৯৪৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার গত কয়েক মাসে দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তীব্র রূপ নেয়। নভেম্বর মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯ জনে, যা এ বছরের যেকোনো মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। অক্টোবর মাসে মৃত্যু হয়েছে ৮০ জন রোগীর এবং সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৭৬ জন। এ তিন মাসেই দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়া পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং এডিস মশার বিস্তারের উপযোগী পরিবেশ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার প্রধান কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব এডিসের প্রজনন বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এ বছর আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি, লাল দাগ বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে নিকটস্থ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময় চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনগণকে নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তিন দিন অন্তর জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া, ফুলের টব, ছাদ, ড্রেন, পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার এবং দিনের বেলায় মশারোধী লোশন ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিতে বিশেষ ওয়ার্ড ও মনিটরিং টিম সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইডিং ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
চলতি বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আবারও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে তারা উল্লেখ করেছে।
আকাশজমিন / আরআর