ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

জাতীয় সংসদ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে: শহীদ হাদির মর্যাদাপূর্ণ দাফন


  • আপলোড সময় : শনিবার ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ৪:৪২ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এবং মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজার নামাজে দূরদূরান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অনেকেই অশ্রুসিক্ত নয়নে দু’হাত তুলে হাদির জন্য দোয়া করছেন, কেউ কেউ ‘তুমি কে, আমি কে? হাদি, হাদি; আমরা সবাই হাদি হবো’ ও ‘বিচার বিচার বিচার চাই, হাদি হত্যার বিচার চাই’-এমন স্লোগান দিচ্ছিলেন।

জানাজার নামাজ পড়ান তার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। তিনি জানাজার আগে এক আবেগঘন বক্তৃতায় জাতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন রাখেন। তিনি বলেন, “ওসমান হাদির সন্তানের এখন ৮ মাস বয়স। সন্তান হওয়ার পর সে আমাকে বলেছিল, ভাই, আমার সন্তানের জন্য এমন একটি নাম নির্বাচন করুন, যা বিপ্লবী চেতনা বহন করবে। নাম হবে সাহসিকতার পরিচয়। আমরা সেই নাম দিয়েছি ‘ফিরনাস’, যার অর্থ বিপ্লবী ও সাহসী। আজ ওর সন্তানের দিকে তাকানো যায় না। আমাদের মা প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছেন, জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। আমাদের ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল শরীফ ওসমান বিন হাদি। আজ তার লাশ আমার কাঁধে বহন করতে হচ্ছে। আমি জাতির কাছে প্রশ্ন রাখি, যদি প্রকাশ্য দিবালোকে রাজধানীতে খুনি গুলি করতে পারে, তাহলে আমাদের লজ্জা ছাড়া আর কিছু নেই। যদি বর্ডার ক্রস হয়ে যায়, তারা কেমন করে চলে গেল তা জানতে চাই।”


জানাজার নামাজে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। ছাত্র-জনতাও বহু দূর থেকে এসে অংশ নিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “আমার জীবদ্দশায় এত বড় জানাজার নামাজ আর কখনও দেখিনি। ভাগ্য খারাপ শেষ বারের মতো হাদি ভাইকে চোখের দেখা করতে পারিনি।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিবুল রানা বলেন, “জিয়াউর রহমানের জানাজার নামাজেও অনেক লোক হয়েছিল, কিন্তু তখন আমার জন্ম হয়নি। আমার জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে বড় জানাজার নামাজ এটি। দোয়া করি আল্লাহ হাদিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।”

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “হাদি তুমি হারিয়ে যাবে না। কোনোদিন তোমাকে কেউ ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলেছো তা আমরা পূরণ করব। বাংলাদেশসহ সবার এই ওয়াদা পূরণ হবে। তোমার মানবপ্রেম, মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আমরা মনে প্রাণে গ্রহণ করেছি। তোমার মন্ত্র চিরদিন আমাদের কানে বাজতে থাকবে। আমরা দুনিয়ার কাছে মাথা উঁচু করে চলবো, কারো কাছে মাথা নত করবো না।”

হাদির জানাজার নামাজ শেষে তার মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হয়। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি চত্বরে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহ ফ্রিজার ভ্যান থেকে কবর দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়।

শহীদ হাদি ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে আততায়ীর গুলিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ারে চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর হেলিকপ্টারে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১০টায় মারা যান। ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মরদেহ দেশে আনা হয় এবং বিমানবন্দর থেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।

শহীদ হাদির মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হচ্ছে। সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।

এদিকে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. তাজিন আফরোজ শাহকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অধ্যাপক ডা. মো. মোতাহার হোসেন ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়, আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে তিনি মেডিসিন বিভাগ থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাবেন এবং ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


এছাড়া, গোপীবাগের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মির্জা আব্বাস তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এক প্রস্তুতিসভায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “দেশের যারা ভালো চায় না, যারা গণতন্ত্রের শত্রু, তাদের কার্যক্রম ধারাবাহিক। প্রথম আলো-ডেইলি স্টারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হলো এরা কারা, এরা জাতির শত্রু।” তিনি সরকারের কাছে নির্দেশ দেওয়ার জন্য দাবি জানান, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা বন্ধ করতে।

শহীদ হাদির জানাজায় দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষ, রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র-জনতা ও সাধারণ জনগণ উপস্থিত ছিলেন। মানিক মিয়া এভিনিউয়ে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। উপস্থিতরা নানা স্লোগান ও প্রার্থনার মাধ্যমে হাদির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

জানাজার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে হাদির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশিত হলো। তার জীবন, মানবপ্রেম ও রাজনৈতিক সংগ্রামের স্মৃতি ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। ছাত্র, তরুণ ও প্রজন্মের জন্য হাদির আদর্শ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আকাশজমিন / আরআর 

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর