ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম

অভ্যুত্থানের নারী মুখগুলো কেন এনসিপি নিয়ে ক্ষুব্ধ


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ৪:২৮ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণ নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক নারী নেত্রীর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত দলটিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে ফেলেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে প্রকাশ্য বিভাজন দেখা দিয়েছে। এই বিভাজনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভ্যুত্থানের নারী মুখগুলো—যারা এনসিপির জন্মলগ্ন থেকে সংগঠনের আদর্শিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার বিষয়ে আপত্তি থাকায় প্রথমে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। এরপর যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন পদত্যাগ করেন। তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ার ঘোষণা দিলেও তাজনূভা জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচন করবেন না। একই ইস্যুতে দল ছাড়ার ঘোষণা না দিলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। অন্যদিকে, জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলে মন্তব্য করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন।

এই নারীরা সবাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ মুখ। তাদের প্রকাশ্য অবস্থান ও সিদ্ধান্ত এনসিপির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলটির জন্য প্রথম জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় এই বিভাজন এনসিপির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

এনসিপি সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন ছয় নেত্রী। তারা হলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম, তাজনূভা জাবীন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা ও নাহিদা সারোয়ার নিভা। বৈঠকে তারা প্রায় চূড়ান্ত হওয়া জামায়াত-এনসিপি আসন সমঝোতা নিয়ে আপত্তি জানান।

বৈঠক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নারী নেত্রী জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে সরাসরি বিরোধিতা করেন। তারা বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানান, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে তারা একযোগে পদত্যাগ করবেন। একই সঙ্গে তারা বিএনপির সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য চাপ দেন।

এর আগে গত শনিবার জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে এনসিপির ৩০ নেতা একটি চিঠি দেন নাহিদ ইসলামকে। এই চিঠিতে কয়েকজন নারী নেত্রীও স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে নেতারা এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার কথা তুলে ধরেন। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, জামায়াত এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এনসিপির নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও এনসিপির ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।

এনসিপির একাধিক নেতা জানান, দলটির নারী নেত্রীরা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে ভবিষ্যতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান নিয়েও তাদের গভীর আপত্তি রয়েছে। এরই মধ্যে নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীদের ভূমিকা ও অধিকার নিয়ে জামায়াতের দলগত অবস্থান বরাবরই বিতর্কিত। এনসিপির নারী নেত্রীদের প্রকাশ্য আপত্তি ও পদত্যাগের ঘটনা জামায়াতকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

গত শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তাসনিম জারা। এর আগে সন্ধ্যা ৭টার দিকে দলটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে পদত্যাগের কারণ সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি তিনি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মন্তব্য করতে রাজি হননি তাসনিম জারা।

এনসিপি সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তিনি ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। এই লক্ষ্যে গতকাল তিনি ওই আসনের ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন।

এরপর গতকাল সকালে এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলেও জানান। তাঁর ঢাকা-১৭ আসন থেকে এনসিপির হয়ে নির্বাচন করার কথা ছিল। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে তাজনূভা জাবীন বলেন, এনসিপিকে বিদায় জানালেও তিনি রাজনীতি ছাড়ছেন না।

অন্যদিকে, দল থেকে পদত্যাগ না করলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। রোববার সন্ধ্যায় ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ সিদ্ধান্ত জানান। সমকালকে তিনি বলেন, একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর এমন সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তবে তিনি জানান, আপাতত দলের সঙ্গে আছেন এবং পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেননি।

এদিকে, নির্বাচনের সময় দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। গতকাল রাত ১০টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে তিনি এ সিদ্ধান্ত জানান। নুসরাত কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে এনসিপির মনোনয়ন কিনেছিলেন। তিনি লেখেন, জামায়াতে ইসলামীসহ ১০-দলীয় জোটে শর্তসাপেক্ষে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলের মূল বক্তব্য থেকে সরে এসেছে। এতে তৃণমূল ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে ঘোরতর আপত্তি জানালেও পদত্যাগ করেননি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন। তিনি মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান ও সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে বাধ্য করবে। জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের আত্মপ্রকাশের দিন এমন সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, ২৮ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে এনসিপির মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে এনসিপির গঠন প্রক্রিয়ায় নারী নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এভাবে সরে যাওয়া নবীন দলটির জন্য বড় ধরনের হোঁচট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দলে থাকা বা না থাকা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, নির্বাহী পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা বিরোধিতা করছেন, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর