আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়ের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কীভাবে তাদের নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করবেন, তা মনোনয়নপত্রে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
তারেকের ব্যয় নিজস্ব তহবিল থেকে
বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া তারেক রহমানের নির্বাচনী ব্যয়ের সম্ভাব্য মোট পরিমাণ ৬০ লাখ টাকা। এই ব্যয় তার নিজস্ব আয় থেকে আসবে, যার মধ্যে রয়েছে কৃষি খাতের আয় ও ব্যাংক আমানত। তারেক দুটি আসনে প্রতি আসনে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছেন।
মনোনয়নপত্রে উল্লেখিত সম্পদের তথ্য অনুযায়ী, তারেকের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ ও ব্যাংকে জমা টাকা, শেয়ার, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু মিলিয়ে অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৫১ লাখ ১৬ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। তিনি ব্যবসা, পরামর্শক, কৃষি আয়, সম্মানী ভাতা ও ব্যাংকের মুনাফা থেকে এই ব্যয় করবেন। এ হিসাব অনুযায়ী তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্ধারিত ব্যয় করতে পারবেন।
শফিকুরের ব্যয় দলীয় তহবিলের ওপর নির্ভর
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তাঁর মোট সম্পদ প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নগদ টাকা হাতে আছে ৬০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশ আসবে তাঁর দলের তহবিল থেকে। তিনি নিজের নগদ ও ব্যাংকে জমা থেকে খরচ করবেন ১০ লাখ টাকা। বাকি ৩৫ লাখ টাকা আসবে জামায়াতে ইসলামী দলীয় তহবিল থেকে।
শফিকুর নির্বাচনী এলাকার ভোটারসংখ্যা অনুযায়ী ৩৫ লাখ টাকা খরচ করার অনুমতি পেয়েছেন। এই তহবিল প্রধানত দলের নিয়মিত অনুদান থেকে আসে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসন থেকে প্রার্থী। তাঁর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের অনুমোদিত পরিমাণ ৪০ লাখ টাকার কিছু বেশি। হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, নিজের ব্যবসা থেকে ২ লাখ টাকা খরচ করবেন। ভাই-বোনদের দেওয়া স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অনুদান থেকে পাবেন ৫ লাখ টাকা। এছাড়া আত্মীয়-স্বজন নয় এমন পাঁচজনের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা এবং দলীয় তহবিল থেকে ১৫ লাখ টাকা পাবেন।
নাহিদ ইসলামের নির্বাচনী ব্যয় ‘ক্রাউড ফান্ডিং’-এর মাধ্যমে
ঢাকা-১১ আসন (খিলগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা, ভাটারা, হাতিরঝিল) থেকে নির্বাচন করছেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অনুমোদিত নির্বাচনী ব্যয় ৪৪ লাখ ১ লাখ টাকা। এই ব্যয় মূলত ক্রাউড ফান্ডিং বা গণ-অনুদানের মাধ্যমে সংগৃহীত হবে।
নাহিদ ইসলামের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পত্তি নেই, তবে অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩০ লাখ টাকা। নির্বাচনের ব্যয় পুরোপুরি জনগণ থেকে সংগৃহীত তহবিল ও নিজের আয় থেকে পরিচালিত হবে।
তাদের মতো এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন রংপুর–৪ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তাঁর অনুমোদিত ব্যয় ৫০ লাখ টাকা। ১ লাখ টাকা নিজের আয়ের থেকে এবং ৪৯ লাখ টাকা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা।
নির্বাচনী ব্যয়ের প্রেক্ষাপট ও আইনগত সীমা
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন তা নির্বাচনী আইন দ্বারা নির্ধারিত। আগের সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ২৫ লাখ টাকা। নতুন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর ব্যয় হবে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা বা ২৫ লাখ টাকা—যেটি বেশি। ফলস্বরূপ, প্রার্থীরা ২৫ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিনটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
মনোনয়নপত্রের মাধ্যমে প্রার্থীদের অবশ্যই সম্ভাব্য ব্যয়ের উৎসও উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর এসব ব্যয় কমিশন খতিয়ে দেখে না। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রার্থীদের অনেকেই নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়ে ৩ থেকে ৬ গুণ বেশি খরচ করেছেন।
নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও পর্যালোচনা
সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নেতা-কর্মীদের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রার্থী ও দলের নির্বাচনী ব্যয়ের সম্পর্কিত সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনে টাকার খেলা অকল্পনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার জন্য ইসিকে কার্যকর নজরদারি রাখা জরুরি। নির্বাচন শেষে প্রার্থীদের দেওয়া হিসাব খতিয়ে দেখা উচিত।