ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বিএনপির গলার কাঁটা এখন বিদ্রোহী প্রার্থীরা


  • আপলোড সময় : বুধবার ০৭ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৩:৪৮ পিএম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান গড়ার চেষ্টা চালালেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের উত্থান সেই পথকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন বিএনপির জন্য কেবল প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়; বরং দলের ভেতরকার শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

দলীয় সূত্র ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিএনপির অন্তত ১৯০ জন নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১১৫টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সংখ্যার দিক থেকে এটি নজিরবিহীন। শুধু তাই নয়, এসব আসনের বড় একটি অংশ বিএনপির ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে ভোট বিভাজনের আশঙ্কা দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দলীয় ভোটব্যাংক শক্তিশালী, সেখানে একাধিক বিএনপি-ঘনিষ্ঠ প্রার্থী মাঠে থাকলে দলের মূল প্রার্থীর পরাজয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা নির্বাচনী সমন্বয় ও প্রচারণাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, বড় কোনো রাজনৈতিক দলে বিপুলসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকলে কর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। এতে শুধু প্রার্থীর হার নয়, দলীয় সংগঠনের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যায়। তাঁর মতে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সব প্রার্থীকে সরাসরি বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করতে নারাজ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দাবি করছেন, এই ১৯০ জনের সবাই দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাননি। বরং এটি একটি কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ। তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মামলা-মোকদ্দমা, ঋণখেলাপি হওয়া কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে মূল প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় অন্তত ১৫টির বেশি আসনে ‘বিকল্প প্রার্থী’ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, বিকল্প প্রার্থী রাখা নতুন কিছু নয়, তবে এবার পরিস্থিতির কারণে এর পরিসর বড় হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীদের বয়সজনিত অসুস্থতা বা আইনি জটিলতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি কোনো কারণে মূল প্রার্থী বাদ পড়েন, তবেই বিকল্প প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু এই তালিকার বাইরেও যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের নিয়ে দলটি বড় ধরনের চাপে পড়েছে।

এই বিদ্রোহীদের লাগাম টানতে বিএনপি এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কড়া নির্দেশে ইতোমধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দলটি। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোটের মাঠে থাকবেন, তাদের জন্য দলে আর কোনো জায়গা থাকবে না। এই হুঁশিয়ারি শুধু মৌখিক নয়, বাস্তব প্রয়োগও শুরু হয়েছে।

গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার অভিযোগে ৯ জন প্রভাবশালী নেতাকে বহিষ্কার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে দলীয় নির্দেশ অমান্য করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া। দলীয় দফতর সূত্র জানায়, যারা ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত সরে দাঁড়াবেন না, তাদের প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হতে পারে।

বহিষ্কৃত নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন, আব্দুল খালেক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক তারুণ দে, ঢাকা উত্তর সিটি বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ এবং বাঞ্চারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহদি হাসান পলাশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ এলাকায় শক্তিশালী জনভিত্তি রয়েছে। ফলে তাদের বহিষ্কার দলের জন্য দ্বিমুখী প্রভাব ফেলতে পারে—একদিকে শৃঙ্খলার বার্তা যাবে, অন্যদিকে তৃণমূলের ভোট বিভাজনের ঝুঁকি বাড়বে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। দীর্ঘদিন আন্দোলনে শরিক থাকা নেতাদের প্রতি দলের দায়বদ্ধতা থাকলেও সবাইকে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব নয়—এটি বুঝতে হবে।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপির জোটসঙ্গীদের মধ্যেও চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। জোটের হিসাব অনুযায়ী বিএনপি বহু আসন শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দিলেও সেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এতে জোটের মধ্যে টানাপোড়েন তীব্র হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জামিয়াত উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের বিপরীতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার প্রার্থিতা, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের বিপরীতে সাইফুল আলম নীরবের অবস্থান, সিলেট-৫ আসনে উবাইদুল্লাহ ফারুকের বিপরীতে মামুনুর রশীদের প্রার্থিতা—সব মিলিয়ে জোটের সমীকরণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-৪, ভোলা-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, পটুয়াখালী-৩সহ আরও বহু আসনে। কোথাও পাঁচজন পর্যন্ত বিএনপি-ঘনিষ্ঠ প্রার্থী মাঠে রয়েছেন, যা ভোটব্যাংককে বহুভাগে ভাগ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে এবারের নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি ধারার দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, যেখানে বিএনপির মূল প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগ হবে, সেখানে সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিপক্ষ সহজেই এগিয়ে যাবে। বিশেষ করে যেসব আসন জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিদ্রোহীরা থাকলে জোটের ঐক্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দলীয় সূত্র জানায়, তারেক রহমান বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কোনো আপস করতে রাজি নন। তবে একটি শর্তসাপেক্ষ নমনীয়তা রাখা হয়েছে—যারা ২০ জানুয়ারির মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন, তাদের বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৯০ জনের বড় একটি অংশ যদি শেষ পর্যন্ত মাঠে থেকে যান, তবে বিএনপির ভোটব্যাংক মারাত্মকভাবে বিভক্ত হবে। এর সরাসরি সুফল পাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা বিএনপির জন্য এখন অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো এই বিদ্রোহীদের নিবৃত্ত করা। ব্যর্থ হলে, এবারের নির্বাচনে দলটির ভরাডুবির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।



এ সম্পর্কিত আরো খবর