অনলাইন রিপোর্টার
রাজধানীর বেইলি রোড, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড ও গুলশান এলাকায় সরকারি বেশ কিছু বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা হয়েছিল মূলত মন্ত্রীদের থাকার জন্য। সেই কারণে এই এলাকায় থাকা এলাকা এখন মন্ত্রিপাড়া নামে পরিচিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে নির্বাচন কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, বিচারপতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা বসবাস শুরু করেছেন।
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার চাচ্ছে, এই এলাকায় থাকা বাসা শুধুমাত্র মন্ত্রীদের জন্য সংরক্ষিত হোক। এ উদ্দেশ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি আবাসন পরিদপ্তর ইতিমধ্যে ৭১টি বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট চিহ্নিত করেছে, যেগুলো মন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্টকরণের (এয়ারমার্ক) প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন নির্ধারণের পটভূমি
২০১৩ সালে মন্ত্রীদের জন্য ৪১টি বাংলোবাড়ি ও ফ্ল্যাট নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসব বাসা বিচারপতি ও সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।
আবাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাংবিধানিক পদে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য আলাদা বাসা বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তারা মন্ত্রিপাড়ায় বসবাস করছেন। ফলে বাংলোবাড়ি ব্যবহারে নির্দিষ্টকরণের নীতির ব্যত্যয় ঘটছে। এই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য ৭১টি বাড়ি মন্ত্রিপাড়ার অংশ হিসেবে এয়ারমার্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন করে মন্ত্রীদের জন্য বাড়ি নির্ধারণ করতে গত ২ নভেম্বর সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতিমধ্যেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে পুরনো ৪১টির সঙ্গে নতুন ৩০টি বাড়ি যুক্ত করা হয়েছে। নতুন ৩০টি বাড়ির মধ্যে বেইলি রোডে ১৯টি, গুলশানে ৫টি, ধানমন্ডিতে ৫টি এবং মিন্টো রোডে ১টি।
কেন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলো
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরনো প্রজ্ঞাপন এবং বাস্তব ব্যবহারে মিল না থাকার কারণে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রিপাড়ায় কারা থাকতে পারবেন, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকায় এবং মন্ত্রী না থাকায় মন্ত্রিপাড়ার অনেক ফ্ল্যাট খালি ছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে মন্ত্রিপাড়ায় নতুন মন্ত্রীদের আবাসন ব্যবস্থা করতে গেলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ বর্তমানে যারা বাসা ব্যবহার করছেন, তাঁদের সরানো কঠিন হবে।
বেইলি রোডে ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’ নামে তিনটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনে ১০টি করে ফ্ল্যাট, মোট ৩০ জন মন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। বর্তমানে এই ফ্ল্যাটগুলোতে উপদেষ্টা, বিচারপতি, আমলা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বসবাস করছেন।
কমিটির আহ্বায়ক মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রতিবেদন অনুযায়ী ৭১টি বাড়িকে মন্ত্রিদের জন্য নির্দিষ্টকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
বাসা বরাদ্দ ও প্রশাসনিক ব্যত্যয়
পুরনো ৪১টি বাংলোবাড়ি ও ফ্ল্যাট ২০১৩ সালে মন্ত্রিপাড়ার অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়ে সেখানে বিচারপতি ও সাংবিধানিক পদে থাকা কর্মকর্তারা বসবাস শুরু করেছিলেন। এরপর গণ-অভ্যুত্থানের পর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।
নতুন কমিটি প্রতিবেদনে এসব বাড়িকে পুনরায় মন্ত্রিদের জন্য নির্দিষ্ট করার সুপারিশ করেছে। এতে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ঝামেলা কমানো এবং মন্ত্রিপাড়ার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিক রাখা সম্ভব হবে।
কোথায় কত বাড়ি
মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড: ১৫টি বাংলোবাড়ি, বর্তমানে উপদেষ্টা বসবাস।
বেইলি রোড: ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’ তিনটি ভবন, প্রতিটি ১০টি ফ্ল্যাট, মোট ৩০টি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটে আয়তন সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। বর্তমানে উপদেষ্টা, বিচারপতি, আমলা বসবাস করছেন।
গুলশান ও ধানমন্ডি: নতুন করে ৮টি বাড়ি চিহ্নিত করা হয়েছে।
গুলশান ও ধানমন্ডির বিশেষ তথ্য
গুলশানে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ৩৪ শতাংশ জায়গার একতলা বাসায় বসবাস করতেন। বর্তমানে বাসাটি খালি।
গুলশানের ৮৪ নম্বর সড়কে ১০৬ শতাংশ জায়গার একটি বাংলো রয়েছে। এটি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার নামে রেজিস্ট্র দলিলকৃত।
ধানমন্ডিতে একটি বাড়ি সাবেক সচিব হেদায়েতউল্লাহ আল মামুনের নামে।
বর্তমান ব্যবস্থায় প্রশাসনিক প্রয়োজন বা অস্থায়ী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব বাংলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে আবাসন নীতির অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে মন্ত্রিপাড়া এলাকার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বেড়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে যাঁরা এসব বাংলোতে বসবাস করছেন, তাঁদের বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আলোচনা চলছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাটে ভবিষ্যতে মন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ থাকতে পারবে না, এমন প্রস্তাবনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন চাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভার নতুন মন্ত্রীদের জন্য সমস্যা তৈরি না হোক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্বে নির্ধারিত ৪১টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সঙ্গে নতুন ৩০টি বাড়ি যুক্ত করার মাধ্যমে মোট ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট মন্ত্রিপাড়ার অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।