নেত্রকোনা প্রতিনিধি ॥
নেত্রকোনা সদর উপজেলার সতরশ্রী এলাকা থেকে আহত অবস্থায় একটি বিপন্ন প্রজাতির গন্ধগোকুল উদ্ধার করেছে বনবিভাগ। রবিবার সকালে বনবিভাগের কর্মীরা প্রাণীটিকে উদ্ধার করেন। এর আগে শনিবার রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় প্রাণীটি। বর্তমানে জেলা প্রাণী সম্পদ হাসপাতালের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে গন্ধগোকুলটির চিকিৎসা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ সড়কের সতরশ্রী এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি ট্রাকের ধাক্কায় গন্ধগোকুলটি গুরুতর আহত হয়। দুর্ঘটনার পরপরই আশপাশের লোকজন সেখানে ভিড় জমান। প্রাণীটির শরীরের দাগ ও আকৃতি দেখে স্থানীয়দের একটি অংশ এটিকে চিতা বাঘ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ প্রাণীটিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করলে উপস্থিত অনেকেই এতে বাধা দেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও সচেতন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি প্রাণীটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। তারা গন্ধগোকুলটিকে আটক করে নিরাপদ স্থানে রেখে প্রশাসন ও বন বিভাগকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে রবিবার সকালে বনবিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত অবস্থায় প্রাণীটিকে উদ্ধার করেন।
নেত্রকোনা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জসিম উদ্দিন এলাহী জানান, উদ্ধার করা গন্ধগোকুলটিকে বনবিভাগের প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছে এবং জেলা প্রাণী সম্পদ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “গন্ধগোকুলটি একটি সংরক্ষিত ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। সুস্থ হয়ে উঠলে এটিকে আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরনারি চিকিৎসক মিজানুর রহমান জানান, প্রাণীটির শারীরিক অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গন্ধগোকুলটির মুখ, জিহ্বা ও মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। মাথার কিছু অংশ ডেবে গেছে এবং জিহ্বার আংশিক কাটা পড়েছে। এসব কারণে প্রাণীটির স্বাভাবিক চলাচল ও খাদ্য গ্রহণে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আরও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে প্রাণীটির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।”
ঠাকুরাকোনা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আতিকুর রহমান জানান, গন্ধগোকুলটি আকারে বেশ বড়। লেজসহ এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ সেন্টিমিটার, উচ্চতা প্রায় তিন ফুট এবং ওজন আনুমানিক পাঁচ কেজি। তিনি বলেন, শরীরের দাগের কারণে স্থানীয় অনেকেই একে চিতা বাঘ ভেবে ভুল করেছিলেন। তবে স্থানীয়দের সচেতনতার কারণে কেউ প্রাণীটিকে আঘাত করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, নিশাচর প্রাণী হওয়ায় এটি রাতে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গন্ধগোকুল একটি নিরীহ কিন্তু বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। ২০০৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) প্রাণীটিকে ‘বিপন্ন’ তালিকাভুক্ত করে। এছাড়া বাংলাদেশে ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ীও এটি সংরক্ষিত প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত।
গন্ধগোকুল বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। শত্রু দেখলে আত্মরক্ষার জন্য প্রাণীটি একধরনের কাঁদানে গ্যাস স্প্রে করে, যা শিকারিকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক সময় মানুষ ভুল করে একে ভয়ংকর প্রাণী মনে করে।
নিরীহ স্বভাবের এই প্রাণীটি গন্ধগোকুল ছাড়াও ছোট বাগডাশ, ছোট খাটাশ, গন্ধগুলা, হাইলটালা ইত্যাদি নামেও পরিচিত। এদের আয়ুষ্কাল সাধারণত প্রায় ১৫ বছর। ঝোপঝাড়, বাগান, বনাঞ্চল এবং কখনো কখনো বাড়ির ছাদে এরা বাসা বাঁধে।
খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে গন্ধগোকুল সর্বভুক। ধানখেতের ইঁদুর, গেছো ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, ছোট পাখি, ডিম, ব্যাঙ, শামুক ও বিভিন্ন ধরনের ফল এদের প্রধান খাদ্য। তাল ও খেজুরের রস এদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য হিসেবে পরিচিত। বছরে অন্তত দুইবার এরা বাচ্চা দেয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং সড়ক দুর্ঘটনার কারণে গন্ধগোকুলসহ অনেক বন্য প্রাণী হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় সড়ক পার হওয়ার সময় এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অনেক প্রাণী।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি। দুর্ঘটনায় আহত প্রাণী দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত বন বিভাগ বা প্রশাসনকে জানানোই সবচেয়ে নিরাপদ ও মানবিক পদক্ষেপ।
বর্তমানে আহত গন্ধগোকুলটির চিকিৎসা চলছে এবং বন বিভাগ নিয়মিত এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। চিকিৎসক ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা আশাবাদী, যথাযথ পরিচর্যা পেলে প্রাণীটি সুস্থ হয়ে আবার প্রকৃতিতে ফিরে যেতে পারবে।
আকাশজমিন / আরআর