অনলাইন রিপোর্টার
শিক্ষা শুধু চাকরির উপযোগী জনশক্তি তৈরির জন্য নয়, বরং সৃজনশীল, স্বাধীন চিন্তাশীল ও উদ্ভাবনী মানুষ গড়ে তোলার জন্য হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, মানুষ জন্মগতভাবেই সৃজনশীল; কিন্তু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় সেই সৃজনশীলতাকে দমন করে কেবল চাকরির প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা–২০২৬’ শীর্ষক দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, শিক্ষা যদি কেবল চাকরি পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাকে জাগ্রত করা। শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, নতুন ধারণা তৈরিতে উৎসাহিত করবে এবং সমাজের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে সক্ষম করে তুলবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি করলে চলবে না। বরং তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। উদ্যোক্তা মানসিকতা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই বিকশিত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া একটি বিপুল সম্ভাবনাময় অঞ্চল। এই অঞ্চলে তরুণ জনসংখ্যা, সৃজনশীল মেধা ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বিভাজন এবং ভুল নীতিনির্ধারণের কারণে অনেক সময় এসব সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। শিক্ষা হতে পারে সেই শক্তি, যা দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করে তুলবে।
ড. ইউনূস বলেন, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে কেবল ডিগ্রি বা সনদ নয়, বরং চিন্তার গভীরতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানবিক মূল্যবোধই মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করবে। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পাঠ্যসূচি নির্ভর জ্ঞান নয়, বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে তা থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। নতুন ধারণা বাস্তবায়নের পথে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু সেই ব্যর্থতাই ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়। শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সেই সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগানো।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে উচ্চশিক্ষার বর্তমান চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।