অনলাইন রিপোর্টার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা ‘টার্গেট কিলিং’ এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সম্ভাব্য প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার অভাব সাধারণ মানুষকেও গভীর শঙ্কায় ফেলেছে।
ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর নির্বাচনি মাঠে থাকা প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। অনেক নেতা এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি ‘গানম্যান’ নিয়োগ করছেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি রোধে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ ঘোষণা করেন। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ দিনের অভিযানে সারা দেশে ১৫ হাজার ৯ জনকে গ্রেফতার এবং ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এত বিপুল সংখ্যক গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার সত্ত্বেও হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হয়নি, ফলে জনমনে স্বস্তি ফিরছে না।
রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অনেকে। অপারেশন চলাকালেই ৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে কাওরান বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১ ডিসেম্বর জুরাইনে অটোরিকশা চালক পাপ্পু শেখকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৩০ নভেম্বর খুলনায় আদালতের সামনে দুর্বৃত্তরা ফজলে রাব্বি রাজন ও হাসিব হাওলাদারকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করে। ১৭ নভেম্বর পল্লবী সেকশন-১২ এলাকায় একটি হার্ডওয়্যার দোকানের মধ্যে ঢুকে যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, নরসিংদী ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় নিখোঁজের একদিন পর মোহাম্মদ শাহেদ ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে নিখোঁজের দুই দিন পর ৭ বছরের শিশু শিক্ষার্থী সিনথিয়া খানম বৃষ্টির মরদেহ পাওয়া যায়। ৫ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশে মুদি দোকানী মনি চক্রবর্তীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিনে চট্টগ্রামের রাউজান ও যশোরের মনিরামপুরে দুইজন নিহত হন। যশোরের কপালিয়া বাজারে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে গুলি ও ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার করালি নওশবা গ্রামে বাসায় ঢুকে সোহেল রানা নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে নিখোঁজের দুই দিন পর পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা মনিরের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রার্থীদের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-১২ আসনের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, “শরিফ হাদি ও মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর ভোটার ও প্রার্থীরা আতঙ্কে আছেন। সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে পারছে না। মৃত্যুভয় নিয়ে মাঠে কাজ করতে হচ্ছে।” নোয়াখালী-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাহস নিয়ে এগোতে হচ্ছে, তবে আমরা সতর্ক আছি।”
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৫০৯ জন খুন হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ১০২। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৫। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলছে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৩ জন নিহত হয়েছেন, ২০২৩ সালে ৯৬ জন।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো মূলত চাঁদাবাজি ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে হয়েছে। যারা এখন হত্যার শিকার হচ্ছে তারা অপরাধ জগতের, তবে নির্বাচনের আগে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, “টার্গেট কিলিং প্রতিরোধ করা কঠিন হলেও পুলিশ কাজ করছে। বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।”
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “টার্গেট কিলিং প্রতিরোধ সম্ভব। উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। দেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং প্রযুক্তি ব্যবহার উন্নত হলে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড কমানো সম্ভব।”
কারা অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের সময় ও পরবর্তীতে ১৭টি কারাগারের বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগারের বন্দিদের মধ্যে ২ হাজার ২৩২ জন পালিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে ৭১০ জন এখনও অধরা। এছাড়া পুলিশি স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৩টি এখনও উদ্ধার হয়নি। এই বিপুল পরিমাণ বেহাত অস্ত্র নির্বাচনের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইজিপি বাহারুল আলম জানান, পলাতক বন্দি ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
আকাশজমিন / আরআর