ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পান্থকুঞ্জ পার্কে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ!


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ১:০৮ পিএম

আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সবুজ এলাকা পান্থকুঞ্জ পার্কে চলছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। বিষয়টি ঘিরে পরিবেশবিদ, পরিকল্পনাবিদ, আইনজীবী ও নগর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে সরকারের প্রশ্রয়েই প্রাইভেট কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় এই নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি বিশ্বজিৎ দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হোটেল সোনারগাঁও সংলগ্ন পান্থকুঞ্জ পার্কে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। একই সঙ্গে পার্কটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন আদালত। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের দেওয়া সেই আদেশ আপাতত বহাল রাখেন।

আদালতের ওই আদেশের পর একাধিকবার মামলাটির শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও নানা অজানা কারণে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। মামলার পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি এখনো না হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পান্থকুঞ্জ পার্কে থেমে নেই এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতি আরও বেড়েছে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পার্কে নির্মাণকাজ চলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইনজীবীরা। তাদের মতে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি উপেক্ষা করে এভাবে একটি জনসাধারণের পার্কে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা অভিযোগ করেন, সরকারের ভেতরে থাকা কিছু উপদেষ্টা ও প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ জড়িত থাকায় তড়িঘড়ি করে দিন-রাত কাজ চালানো হচ্ছে।

হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের কারণে হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় কিছুদিনের জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা পুনরায় শুরু হয়। জানা যায়, নিষেধাজ্ঞা জারির সপ্তাহ দুয়েক পর থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পার্ক এলাকায় আবার কাজ শুরু করে। দ্রুত কাজ শেষ করার লক্ষ্যে ২৪ ঘণ্টা ধরে শ্রমিক নিয়োজিত রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে পান্থকুঞ্জ পার্কে গিয়ে দেখা যায়, পুরো পার্কটি ঘিরে ফেলা হয়েছে। একটি বড় ক্রেন দিয়ে মাটি খননের কাজ চলছে। সেখানে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক একযোগে কাজ করছেন। কেউ খনন করা মাটি সরাচ্ছেন, কেউ রড বাঁধছেন, আবার কেউ ট্রাকে করে আসা নির্মাণসামগ্রী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করছেন।

পান্থকুঞ্জ পার্কে কর্মরত শ্রমিক আরিফ হোসেন জানান, তারা প্রায় পাঁচ মাস ধরে সেখানে কাজ করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ও দিনে মিলিয়ে সারাক্ষণই কাজ চলছে। তবে দিনের তুলনায় রাতেই কাজ বেশি করা হয়। সপ্তাহে খুব অল্প সময় দিনের ডিউটি থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই রাতের ডিউটি করতে হয়। তিনি জানান, দৈনিক গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন শ্রমিক সেখানে কাজ করেন।

শ্রমিকরা আরও জানান, কোম্পানির পক্ষ থেকে দিনের বেলায় সতর্কভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে নজর এড়াতে রাতের বেলায় বেশি শ্রমিক রেখে কাজ চালানো হয়।

হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় চলমান নির্মাণকাজের বিষয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় না হলেও কাজ চালাতে আইনি কোনো জটিলতা নেই। তার মতে, এটি একটি সরকারি প্রকল্প এবং এখানে ব্যক্তি বা কোম্পানির চেয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাবে। সরকার না চাইলে এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পান্থকুঞ্জ পার্কে চলমান এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে দায়ের করা রিটের অন্যতম আবেদনকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এই কাজ চলছে এবং এটি স্পষ্টত আদালত অবমাননার শামিল। তার মতে, সরকার চাইলে সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা যেত, কিন্তু সে পথে না গিয়ে জেদ ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল জলাধারের উন্মুক্ত স্থান রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ জনগণের আন্দোলন, গণশুনানি ও আইনি লড়াই হয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেই জনমত ও আইনকে উপেক্ষা করে প্রাইভেট সেক্টরের স্বার্থ রক্ষায় সরকার নিজেই আইন অমান্য করছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে আবারও শুনানি রয়েছে এবং আদালতের আদেশ অমান্যের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, প্রাইভেট কোম্পানির স্বার্থ জড়িত থাকায় সরকার জনমতকে গুরুত্ব দেয়নি। তার মতে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং সরকার বিকল্প পরিকল্পনার কথা ভাবতেও রাজি হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, চলমান কাজ সরাসরি আদালত অবমাননার পর্যায়ে না পড়লেও এটি নৈতিকতাবিরোধী। তিনি বলেন, হাতিরঝিল–পান্থকুঞ্জ পার্ক অংশে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ রায় হয়নি। অথচ কোনো অন্তর্বর্তী অনুমতির আগেই তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করা হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ।

পান্থকুঞ্জ পার্কে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বন্ধে মোট ৯ জন রিট আবেদনকারী আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আনু মুহাম্মদ, গীতি আরা নাসরীন, আদিল মুহাম্মদ খান, সামিনা লুৎফা, লেখক ফিরোজ আহমেদ, গবেষক পাভেল পার্থ, আইনজীবী মাহবুবুল আলম তাহিন এবং বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাঈম উল হাসান ও আমিরুল রাজীব। তাদের দাবি, এই প্রকল্প চালু থাকলে হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পরিবেশের পাশাপাশি কাঁঠালবাগান, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, পলাশী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট এলাকায় যান চলাচল ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর