ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-৪ ঘিরে জমে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—এই তিন দলের প্রার্থীরা নিয়মিত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগেই এলাকাজুড়ে প্রচার তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছে। কে জিতবে এই আসনে—ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা নাকি হাতপাখা—তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসন। শ্যামপুর, দনিয়া ও কদমতলী এলাকা নিয়ে এই আসনটি রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে শ্রমজীবী মানুষ, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট, জলাবদ্ধতা, ভাঙা সড়ক, মাদক ও মশার উপদ্রব এই এলাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তানভীর আহমেদ রবিন। তিনি তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদের ছেলে এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব। প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি। বাবার রাজনৈতিক পরিচিতির পাশাপাশি নিজ দলের সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তানভীর আহমেদ রবিন।
তফসিল ঘোষণার আগেই তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দোয়া মাহফিল, মতবিনিময় সভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে এলাকার মানুষের সমস্যা শুনছেন এবং সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক শক্তিশালী। পাশাপাশি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু ভোটও ধানের শীষের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ঢাকা-৪ আসনের মানুষ শান্তি ও নিরাপদ জীবন চায়। তিনি রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছেন। বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার আলোকে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার বিশ্বাস, জনগণ সুযোগ দিলে তিনি সর্বোচ্চটা দিয়ে এই এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন।
জামায়াতে ইসলামির হয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন সৈয়দ জয়নুল আবেদীন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের শুরা ও কর্মপরিষদের সদস্য এবং শ্যামপুর জামায়াতের সাবেক আমির। পেশায় একজন ব্যাংকার হলেও দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দলীয় সূত্র জানায়, ঢাকার অন্যান্য আসনের তুলনায় ঢাকা-৪ আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত।
পটপরিবর্তনের পর থেকে জামায়াত এই এলাকায় সক্রিয়ভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সৈয়দ জয়নুল আবেদীন নিয়মিত মাঠে নেমে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন। তার দাবি, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছ থেকেই ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায় এবং এবার দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট দিতে আগ্রহী।
সৈয়দ জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, শ্যামপুর, দনিয়া ও কদমতলী এলাকা জামায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তাদের বড় একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। তিনি আশাবাদী, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এই আসনে জামায়াত ভালো ফল করবে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন অধ্যক্ষ সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ। একই সঙ্গে তিনি চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের বড় ভাই। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক বিল্লাহ বলেন, এবার সব জায়গায় হাতপাখার রব উঠেছে। মানুষ ধান, নৌকা, লাঙ্গলসহ বিভিন্ন প্রতীকের রাজনীতি দেখেছে। এবার তারা বিকল্প চায়। ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন। নির্বাচিত হলে মাদক, গ্যাস সংকট, মশা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাগুলো নিরসনে কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
২০১৮ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেবার রাতের ভোটে নির্বাচন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবুও তারা ভালো ভোট পেয়েছিলেন। এবার নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ঢাকা-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭০৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৩৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন। মোট ভোটারের প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ ভোটার, যা এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, তারা সৎ, যোগ্য ও কর্মক্ষম জনপ্রতিনিধি চান। দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে যিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে পারবেন, তাকেই ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন তারা। শান্তি, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশই তাদের প্রধান চাওয়া।
এই তিন প্রার্থী ছাড়াও ঢাকা-৪ আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জনতার দলের মো. আবুল কালাম আজাদ, মুক্তিজোটের সালেহ আহম্মেদ সোহেল এবং বাসদের মো. জাকির হোসেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ঢাকা-৪ আসনে ভোটারদের মন জয় করতে পারে কে—ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা নাকি হাতপাখা।