সৌরজগতের বাইরের ‘সুপার-আর্থ’ গ্রহগুলোতে প্রাণের বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা আগের চেয়ে আরও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তুলনায় আকারে বড় এই গ্রহগুলোর ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে পারে। এর ফলে এসব গ্রহে প্রাণের উদ্ভব এবং কোটি কোটি বছর ধরে টিকে থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হচ্ছে।
সুপার-আর্থ বলতে এমন গ্রহকে বোঝানো হয়, যেগুলোর আকার পৃথিবীর চেয়ে বড় কিন্তু নেপচুনের চেয়ে ছোট। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোর মধ্যে এই ধরনের গ্রহের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ নিজ নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে। নক্ষত্র থেকে এমন দূরত্বে অবস্থিত এই অঞ্চলে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা থাকে, যা প্রাণের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
বিজ্ঞানীদের আগ্রহের মূল কারণ হলো—এই সুপার-আর্থগুলো কি কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণধারণের উপযোগী পরিবেশ ধরে রাখতে সক্ষম। নতুন গবেষণা বলছে, অনেক সুপার-আর্থ শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যা গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে এবং ক্ষতিকর বিকিরণের প্রভাব কমিয়ে দেয়।
এই গবেষণায় বলা হয়েছে, সুপার-আর্থের চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর মতো সরাসরি কেন্দ্রভাগ থেকে তৈরি নাও হতে পারে। বরং এটি গ্রহের কেন্দ্র এবং ম্যান্টলের মাঝামাঝি থাকা গলিত পাথরের একটি স্তর থেকে উৎপন্ন হতে পারে। এই ভিন্ন প্রক্রিয়াই সুপার-আর্থগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে চৌম্বক সুরক্ষা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং এই গবেষণার প্রধান মিকি নাকাজিমা এক বিবৃতিতে বলেন, একটি গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সুপার-আর্থগুলো তাদের কেন্দ্র অথবা ম্যাগমার স্তরে ডায়নামো তৈরি করতে পারে, যা এসব গ্রহের বাসযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
গত ১৫ জানুয়ারি ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল দীর্ঘদিনের একটি বৈজ্ঞানিক রহস্যের সমাধান দিয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এতদিন প্রশ্ন ছিল—পৃথিবীর তুলনায় ভিন্ন অভ্যন্তরীণ গঠন থাকা সত্ত্বেও সুপার-আর্থগুলো কীভাবে তাদের চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখে। নতুন এই গবেষণায় সেই প্রশ্নের একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা উঠে এসেছে।
নেচার অ্যাস্ট্রোনমির সিনিয়র এডিটর লুকা মালতাগলিয়াতি এক বিশ্লেষণে লেখেন, ভিনগ্রহগুলো চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির ক্ষেত্রেও সৌরজগতের পরিচিত নিয়ম অনুসরণ করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেসব গ্রহের ভর পৃথিবীর চেয়ে তিন থেকে ছয় গুণ বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির মূল ইঞ্জিনটি কেন্দ্রভাগে না থেকে কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মধ্যবর্তী কোনো স্তরে থাকতে পারে।
একটি গ্রহকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য দীর্ঘস্থায়ী চৌম্বকীয় ঢাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এই ঢাল নক্ষত্র থেকে আসা প্রবল বায়ুপ্রবাহ বা স্টেলার উইন্ডের আঘাত থেকে গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে এটি গ্রহের পৃষ্ঠকে ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে নিরাপদ রাখে। এমন সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো গ্রহ নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করলেও সেখানে প্রাণের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায় ৩০০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রয়েছে। এটি মূলত পৃথিবীর কঠিন অন্তঃকেন্দ্রকে ঘিরে থাকা তরল লোহার স্তরের নড়াচড়ার মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা, সুপার-আর্থের মতো বড় পাথুরে গ্রহগুলোর কেন্দ্রভাগ পুরোপুরি কঠিন অথবা পুরোপুরি তরল হতে পারে, যার ফলে পৃথিবীর মতো প্রথাগত পদ্ধতিতে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হওয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ব্যাখ্যা হিসেবে নাকাজিমা ও তাঁর দল ‘বাসাল ম্যাগমা ওশেন’ বা বিএমও নামের একটি বিকল্প প্রক্রিয়ার কথা তুলে ধরেছেন। এটি মূলত গ্রহের কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মাঝখানে অবস্থিত গলিত পাথরের একটি গভীর স্তর। গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রহ গঠনের শুরুর দিকে বড় বড় সংঘর্ষের ফলে এমন ম্যাগমা মহাসাগরের সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পারে।
গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রচণ্ড চাপে আয়রন-সমৃদ্ধ ম্যাগমা ধাতব বৈশিষ্ট্য অর্জন করে এবং বিদ্যুৎ পরিবাহী হয়ে ওঠে। এর ফলে বিএমও-চালিত ডায়নামোর মাধ্যমে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি সম্ভব হয়। গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর ভরের তিন থেকে ছয় গুণ বেশি সুপার-আর্থ কয়েকশ কোটি বছর ধরে এই ধরনের চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখতে সক্ষম হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এসব চৌম্বক ক্ষেত্র কিছু ক্ষেত্রে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান বা তার চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। যদিও ভিনগ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র সরাসরি শনাক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, তবে ভবিষ্যতের উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শক্তিশালী ডায়নামোগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: স্পেসডটকম
আকাশজমিন / আরআর