ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীতে বিপাকে দল, বদলে যেতে পারে নির্বাচনি হিসাব


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৯:১৫ এএম

সারা দেশে অন্তত ৭০টি সংসদীয় আসনে বিএনপির ভেতর থেকে উঠে আসা বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলটির আনুষ্ঠানিক মনোনীত প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনি মাঠে একাধিক প্রার্থী থাকায় বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এতে শুধু মনোনীত প্রার্থীরাই নয়, বিএনপির শরিক দলগুলোর প্রার্থীরাও অস্বস্তিতে পড়েছেন। অনেক আসনে এর প্রভাব চূড়ান্ত নির্বাচনি ফলাফলেও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিএনপির হাইকমান্ড এখনও আশা করছে, ভোটের আগেই দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে সরে দাঁড়াবেন বিদ্রোহীরা। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে দলের জন্য কাজ করেও মনোনয়ন না পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। অনেকের বক্তব্য, নির্বাচনে জয়ী হলে দল শেষ পর্যন্ত তাদের গ্রহণ করবেই—এই বিশ্বাস থেকেই তারা নির্বাচনি মাঠে রয়ে গেছেন।

২২ জানুয়ারির পর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পর তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের মতে, একাধিক বিএনপি-ঘেঁষা প্রার্থী মাঠে থাকলে দলীয় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যার সরাসরি সুবিধা নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী জোট ও দলগুলো। কয়েকটি আসনে আগে যেখানে ফলাফল তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত মনে করা হচ্ছিল, সেখানে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯২টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেয়। বাকি আটটি আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো নিজেদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে। ২৯২টি আসনের মধ্যে শুরুতে আইনি জটিলতায় তিনটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে চূড়ান্ত আপিলে দুজন প্রার্থী মনোনয়ন ফিরে পান। সে হিসাবে বর্তমানে ২৯১টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর বিপরীতে মনোনয়ন না পাওয়া বহু নেতা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন।

দলীয় হিসাব অনুযায়ী, বিএনপির সমর্থন পাওয়া অন্তত ৬২টি আসনে এখনও ৭২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে অনেক আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা চাপে পড়েছেন। দফায় দফায় বৈঠক ও আলোচনার পরও তাদের বড় অংশকে সরানো যায়নি। ইতোমধ্যে ৭১ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তারা ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকলে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কারণ অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় পরিচিত মুখ এবং তাদের নিজস্ব সমর্থনভিত্তি রয়েছে। ফলে তারা সরাসরি ধানের শীষের ভোট কেটে নিতে সক্ষম।

ঢাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ঢাকায় বিএনপিকে কোনো আসন না দেওয়ার কৌশলের কথা বলা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের পেছনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতিই বড় ভরসা হয়ে উঠছে।

ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম (তুলি)। তার বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু)। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তিনি বহিষ্কৃত হয়েছেন। একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ব্যারিস্টার আরমান। এই আসনটি বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাবের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঢাকা-৭ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর এখনও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে নির্বাচনে আছেন। এ ছাড়া রাজবাড়ী-২, মাদারীপুর-১, মাদারীপুর-২, কিশোরগঞ্জ-৫, মুন্সীগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-৩, টাঙ্গাইল-৫, মানিকগঞ্জ-১, মানিকগঞ্জ-৩ ও গোপালগঞ্জ-২ আসনেও বিএনপির সাবেক নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

উত্তরবঙ্গেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপির হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে উঠেছে। নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের বিপরীতে ডা. ইয়াসিন আরশাদ রাজন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ডা. আরশাদ পুতুলের বড় ভাই হওয়ায় পরে সরে দাঁড়ালেও তাইফুল ইসলাম টিপু এখনও মাঠে রয়েছেন।

রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলামের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসফা খায়রুল হক শিমুল। নাটোর-৩ আসনে অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনুর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাউদার মাহমুদ নির্বাচন করছেন। নীলফামারী-২, দিনাজপুর-২ ও গাইবান্ধা-৫ আসনেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন।

বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আটটি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতিতে শরিক দলের প্রার্থীরা অস্বস্তিতে পড়েছেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে বিএনপির সমর্থন পেলেও তিনটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। সিলেট-৬ আসনে উবায়দুল্লাহ ফারুকের বিপরীতে মামুনুর রশীদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জুনায়েদ আল হাবিবের বিপরীতে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনির হোসেন কাসেমীর বিপরীতে মোহাম্মদ শাহ আলম ও গিয়াস উদ্দিন মাঠে রয়েছেন।

পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক নুরের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন হাসান মামুন। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হকের বিপরীতে স্বতন্ত্র হিসেবে সক্রিয় আছেন সাইফুল আলম নীরব।

এ বিষয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, তার সঙ্গে দলের মূলধারার নেতাকর্মীরা রয়েছেন এবং নির্বাচনের আগে আরও অনেকে একত্রিত হবেন বলে তিনি আশাবাদী। অপরদিকে কুমিল্লা-৭ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম শাওন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে থাকার পরও মনোনয়ন না পাওয়ায় তৃণমূলের চাপে তিনি নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন।

একজন চট্টগ্রাম বিভাগের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জানান, ধানের শীষের পক্ষে সাধারণ ভোটারদের সমর্থন থাকলেও দলের একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরাতে বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিক দফায় বৈঠক হয়েছে। এমনকি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিছু প্রার্থী সরে দাঁড়ালেও অধিকাংশ এখনও মাঠে রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, এটি শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় ব্যর্থতা এবং শেষ পর্যন্ত এর খেসারত দিতে হতে পারে দলটিকে।

বিএনপির হাইকমান্ড অবশ্য এখনও আশাবাদী। দলের নেতারা বলছেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অনেকেই সরে দাঁড়াবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর