আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনি মাঠ। প্রচারণার শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, তর্কাতর্কি এবং উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। মাত্র এক সপ্তাহ না পেরোতেই সেই তর্কবিতর্ক রূপ নিয়েছে সংঘর্ষে, যার ফলে প্রাণহানি ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণার সময় একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত একজন নিহত এবং বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
এদিন শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত নির্বাচনি ইশতাহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে সামনের সারির চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এতে ঝিনাইগাতী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহত রেজাউল করিমের মৃত্যুতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
একই দিনে রাজধানীর কদমতলীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামীর এক নারী নেত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটে। আহত ওই নেত্রীর নাম কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি। তিনি জামায়াতের রুকন।
ঘটনার বিবরণে কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি জানান, ঢাকা-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের কাজে বাধা দেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তার জন্য তিনি একটি সরু গলির মধ্যে ঢুকলে হঠাৎ একজন ব্যক্তি তার মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ মেরে পালিয়ে যায়। এতে তার মাথায় গুরুতর জখম হয় এবং চারটি সেলাই দিতে হয়। হামলাকারীকে তিনি শনাক্ত করতে পারেননি বলে জানান।
শেরপুর ও রাজধানীর বাইরে ভোলা ও ফরিদপুরেও একই দিনে নির্বাচনি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভোলা-৪ আসনে চরফ্যাশন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ইসলামী আন্দোলন মনোনীত প্রার্থীর কর্মীদের ওপর একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কর্মীরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর মেয়েসহ তিন নারী কর্মী আহত হন। এ ঘটনায় ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর এক বিএনপি নেতার দীর্ঘ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি সভায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে নারীসহ পাঁচজনকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
নির্বাচনি মাঠে সহিংসতা ও উত্তেজনা প্রসঙ্গে গণসংযোগকালে বিএনপিকে উদ্দেশ করে এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্যপ্রার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, “সারা দেশে ১১ দলীয় জোটের গণজোয়ার দেখে একটি দল পেশিশক্তির প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করছে। গত দুই দিনে আমাদের প্রার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে প্রভাব বিস্তারের জন্য হামলা ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানো হলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, নির্বাচনে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা মেনে নিতে না পেরে হামলা চালানো হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপরদিকে বিএনপি কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, বিজয় তাদের দ্বারপ্রান্তে এবং কোনো চক্রান্তের ফাঁদে পা না দিতে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে।
তবে নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর থেকেই ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে নানা কটূক্তির মাধ্যমে আক্রমণ করে আসছেন ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় জামায়াত জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাকে গ্যাংস্টার, চাঁদাবাজ, ক্রিমিনাল ও গডফাদার বলে আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি এবার বিএনপির আরও দুই নেতাকে সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বুধবার গণসংযোগের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “মির্জা আব্বাসের পাশাপাশি আরও অনেক গডফাদারকে বিএনপি নমিনেশন দিয়েছে। ঢাকা-১১ আসনে কাইয়ুম কমিশনার এবং ঢাকা-৬ আসনে জমিদারপুত্র ইশরাককেও তারা মনোনয়ন দিয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন, এসব প্রার্থী জনগণের ভোটাধিকারকে অগ্রাহ্য করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের শুরুতেই এ ধরনের সহিংসতা ও উত্তেজনা একটি উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে। যদি দ্রুত কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
আকাশজমিন / আরআর