ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রিকুইজিশন শুরু হয়েছে। এতে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, লেগুনা ও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইন অনুযায়ী নির্বাচন ও জনস্বার্থে যানবাহন রিকুইজিশনের বিধান থাকলেও অতীত অভিজ্ঞতায় যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ থাকায় মালিক ও চালকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
নির্বাচনকালীন সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী, নির্বাচন কর্মকর্তা, ভোটকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট মালামাল পরিবহনসহ নানা প্রয়োজনে বিপুল সংখ্যক যানবাহনের প্রয়োজন হয়। সে কারণেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাস মালিক সমিতি ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে যানবাহনের চাহিদা জানানো হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণ, জ্বালানি ও চালকের খোরাকি নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও বাস মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে রাজধানীতে প্রায় পাঁচ হাজার যানবাহন রিকুইজিশনের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার বাস রিকুইজিশনের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে বাস মালিক সমিতিগুলোর বৈঠকে এই চাহিদার কথা জানানো হয়েছে এবং ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মুখপাত্র ও দফতর সম্পাদক জুবায়ের মাসুদ জানান, ৭ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব বাস রিকুইজিশনের আওতায় থাকবে। পুলিশের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, রিকুইজিশনকালীন সময়ে বাসের দৈনিক ব্যাংক কিস্তি বাবদ ন্যূনতম দুই হাজার টাকা, জ্বালানি খরচ এবং চালকদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। তবে নির্দিষ্ট ভাড়ার হার বা লিখিত নিশ্চয়তা না থাকায় মালিকদের মধ্যে শঙ্কা রয়ে গেছে।
রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া এলাকায় ঢাকা-ধামরাই রোডে চলাচলকারী ডি লিঙ্ক পরিবহনের সুপারভাইজার মানিক দেওয়ান জানান, তাদের পরিবহনের ৭৩টি বাসের মধ্যে ৬০টি বাস রিকুইজিশন করা হয়েছে। শনিবার থেকে বাসগুলো নেওয়া শুরু হয়েছে এবং আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাখা হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক গড়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। রিকুইজিশনের ফলে মালিকরা এই আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ক্ষতিপূরণের কথা বলা হলেও নির্দিষ্ট অঙ্ক জানানো হয়নি।
ডি লিঙ্ক পরিবহনের পাশেই ঢাকা-মানিকগঞ্জ রুটে চলাচলকারী শুভযাত্রা পরিবহনের ২০টি বাস রিকুইজিশন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। এতে ওই রুটে যাত্রী পরিবহনে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রিকুইজিশন আতঙ্ক শুধু বাস মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত গাড়ি, লেগুনা ও মাইক্রোবাস মালিকরাও উদ্বিগ্ন। জুরাইন এলাকার লেগুনা চালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় অনেক সময় খাবার ছাড়া আর কোনো সুবিধা পাওয়া যায়নি। সে কারণে রিকুইজিশনের আশঙ্কায় অনেকেই লেগুনা চালানো কমিয়ে দিয়েছেন। তার নিজের একটি লেগুনার কাগজ জব্দ করা হয়েছে এবং যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
মাইক্রোবাস চালক লুৎফর রহমান জানান, জাতীয় নির্বাচনের জন্য মুন্সিগঞ্জে তার মাইক্রোবাসটি রিকুইজিশন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি নিতে পারে, তবে জ্বালানি, চালকের খাবার ও ভাড়াসহ সব সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আগের নির্বাচনে এসব সুবিধা অনেক সময় পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও যানবাহন রিকুইজিশন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে। ‘ট্রাফিক এলার্ট’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে একাধিক সদস্য জানান, ব্যক্তিগত গাড়িও রিকুইজিশনের আওতায় পড়তে পারে। গ্রুপের সদস্য আজহার উদ্দিন লেখেন, তার স্কয়ার নোয়া গাড়িটি একদিন ট্রাফিক পুলিশ থামিয়ে রিকুইজিশনের চেষ্টা করেছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফোনে সেদিন ছাড় পেলেও ভবিষ্যতে গাড়িটি নেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ অনুযায়ী ব্যক্তিগত গাড়িসহ যেকোনো যানবাহনই রিকুইজিশন করা যায়।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, রিকুইজিশন করা গাড়ির জ্বালানি খরচ পুলিশ বহন করবে। চালক খোরাকি ভাতা পাবেন এবং মালিক বিল দিলে তা যাচাই করে পরিশোধ করা হবে। তিনি জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ঢাকা মহানগরীতে সাড়ে চার হাজার যানবাহনের চাহিদা রয়েছে, যা প্রায় পূরণ করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ১০৩-ক ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশ কমিশনারের লিখিত আদেশে জনস্বার্থে সর্বোচ্চ সাত দিনের জন্য যেকোনো যানবাহন রিকুইজিশন করা যাবে এবং মালিককে নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, যানবাহন রিকুইজিশনের ক্ষেত্রে বিধি ও আইনের কঠোর অনুসরণ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ভাড়া বা হারের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যানবাহন রিকুইজিশনের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর