বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে মাতৃস্নেহে আগলে রাখা সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন। সমুদ্র উপকূলবর্তী এই নোনা পরিবেশের বন শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যই প্রদান করে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিক্ষয় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশকে রক্ষা করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রতি বছর পালিত হয় ‘সুন্দরবন দিবস’। আজ ২০২৬ সালে এটি উদযাপিত হচ্ছে ১৮তম বছর ধরে।
সুন্দরবন দিবস উদযাপনের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়, যাতে মানুষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও দায়িত্বশীল হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের উদ্যোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশের সহযোগিতায় এবং দেশের ৭০টিরও বেশি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে খুলনায়। সুন্দরবন দিবসের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশের সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে রয়েছে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ৩৫৫ প্রজাতির পাখি।
সুন্দরবনের বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৯২ সালে সুন্দরবনকে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেসকো সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করেছে এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র পৃথিবীর জন্য এক অনন্য পরিবেশগত সম্পদ। এখানে নোনা জলের বিশেষ পরিবেশে ম্যানগ্রোভ গাছের বিস্তৃততা স্থানীয় জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তদুপরি, নদী এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলে স্রোত ও ঢেউ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও সম্পদকে রক্ষা করে।
প্রতি বছর সুন্দরবন দিবসে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি আয়োজন করে। এর মধ্যে রয়েছে সচেতনতামূলক সেমিনার, বনায়ন কার্যক্রম, নদী ও জলাশয় পরিচ্ছন্নতা, বনসংরক্ষণ বিষয়ক প্রদর্শনী ও জনসচেতনতা প্রচারণা। এই কার্যক্রমগুলোর মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষিত করা হয় যে, সুন্দরবন রক্ষা করা মানে দেশের নিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা।
এবারও দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে মানুষকে সুন্দরবনের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বসন্তের বাতাসে ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে সুন্দরবন দিবস মিলিয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির মূল্য এবং তার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা।
সুন্দরবন দিবস আমাদের শেখায় যে প্রকৃতি রক্ষা করা শুধু দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য উত্তরাধিকার। মানুষকে সচেতন করে বনভূমি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করার লক্ষ্যই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।

