ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার মাত্র সাতজন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জন বিএনপি থেকে এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় নির্বাচনের পর ২৫ বছর ধরে এই সংখ্যাটি কোনো উন্নতি হয়নি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত ৫০ আসনসহ এই সংসদে মোট ৫৭ জন নারী এমপি থাকবেন, যা মোট সংসদে ১৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব।
এবার নির্বাচনের আগে এবং চলাকালীন সময়ে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ও বৈষম্যমূলক আচরণ নারী প্রার্থীদের ভোট প্রভাবিত করেছে বলে মনে করছেন নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারীরা। দলগুলোর মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতাও আগের মতোই কম ছিল। জুলাই আন্দোলনের পর নারীদের অধিক মনোনয়ন দেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে সেই অঙ্গীকার পূরণ করেনি।
এবার নির্বাচনে জয়ী নারী প্রার্থীরা হলেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির আফরোজা খানম, ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপির ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনের তাহসিনা রুশদীর, নাটোর-১ আসনে বিএনপির ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। রুমিন ফারহানা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বিএনপি এবার মোট ১০ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল।
নারীর ভোট কম পাওয়ার বিষয়ে ফরিদপুর-৩ আসনের জয়ী নায়াব ইউসুফ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, “সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব এবং প্রচারণা এখনও বিরাজ করছে। অনেকে আমাদের দুর্বল ভেবে আসেন। তবে রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ধাপ আমি প্রমাণ করেছি যে নারী পুরুষের তুলনায় সমান বা বেশিও করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, নারীবিদ্বেষী প্রচারণার কারণে নারী প্রার্থীরা সীমিত সংখ্যক জয়ী হয়েছেন।
ঢাকা–১২ আসনের গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতারও বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে থেকে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ছিল ব্যাপক। তিনি মনে করেন, নারীদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার হার বাড়াতে হলে দলগুলোকে বেশি নারী প্রার্থী দিতে হবে, সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং নারীদের নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এর আগে নির্বাচিত সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব কেমন ছিল তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম জাতীয় সংসদে (১৯৭৩-৭৫) ১৫ জন সংরক্ষিত নারী এমপি ছিলেন। দ্বিতীয় সংসদে (১৯৭৯-৮২) সংরক্ষিত ৩০ আসনসহ মোট ৩২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। চতুর্থ সংসদে (১৯৮৮-৯০) সংরক্ষিত আসন ছিল না, ৪ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত ছিলেন। পঞ্চম সংসদে ৫ জন নির্বাচিতসহ মোট ৩৫ জন নারী এমপি ছিলেন। ষষ্ঠ সংসদে ৩ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন এবং ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল। সপ্তম সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সংখ্যা ৮, মোট ৩৮ জন। অষ্টম জাতীয় সংসদে ৭ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত ও ৪৫ সংরক্ষিত আসনসহ মোট ৫২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। নবম জাতীয় সংসদে ২১ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত, পরে সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে মোট ৭০ জন। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ২৩ ও ১৯ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন।
এবার নারীর তুলনায় পুরুষ প্রার্থীরা ২২ গুণ বেশি মনোনয়ন পেয়েছেন। মনোনয়ন অনুযায়ী জয়ী নারীর সংখ্যা মাত্র ৮ শতাংশ। পুরুষ প্রার্থীরা মনোনয়ন অনুযায়ী ১৫ শতাংশ জয়ী হয়েছেন। সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, “নারীরা খারাপ করেননি। বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অভাব এবং কম মনোনয়নের কারণে সংখ্যা কম হয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং নির্বাচনের জন্য পরিচিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, নারীর প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও স্থানীয় পরিচিতি বৃদ্ধি করলে পরবর্তী নির্বাচনে তাদের জয়ী হওয়ার হার অনেক বেশি হবে। নারীর নির্বাচনী অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অর্থাৎ, সরাসরি নির্বাচিত নারী ৭ জন হলেও সংরক্ষিত আসনসহ সংসদে মোট ৫৭ জন নারী এমপি থাকছেন। এই হিসাব নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার তাগিদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য দলের মনোনয়ন, সামাজিক সচেতনতা, নির্বাচনী প্রচারণায় সমতা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নারী নেতৃত্বকে সঠিকভাবে প্রস্তুত করলে ভবিষ্যতে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজে লিঙ্গ সমতার প্রতিফলন ঘটবে।