প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। তিনি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে উন্নত ও মর্যাদাশীল অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমি বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার আয়োজন করা হয়। তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতো নয়। এটি আমাদের ভাষার অধিকার আদায়ের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের স্মারক হিসেবেই এ বইমেলার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি বছর বইমেলার পরিধি ও আয়তন বাড়ছে, প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে গবেষণাধর্মী ও মানসম্মত বই প্রকাশিত হচ্ছে কিনা, কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কিনা—তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। শুধু মেলার পরিসর বৃদ্ধি নয়, পাঠাভ্যাস ও জ্ঞানচর্চার বিস্তারই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। জার্মান দার্শনিক ‘মারকুইস সিসেরো’র একটি উক্তি তিনি উল্লেখ করেন—‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো’। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বই কেবল বিদ্যা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মনন ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম উপকরণ। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, নিয়মিত বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়াম। এতে মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ সৃষ্টি হয়, যা স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। এমনকি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও কমাতে পারে বই পড়ার অভ্যাস।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তবে বই পড়ার ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যদিও ইন্টারনেটেও বই পড়া যায়, তবে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে নির্ভরতা শরীর ও মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বইয়ের পাতায় মুদ্রিত অক্ষরের সঙ্গে পাঠকের যে আত্মিক সংযোগ তৈরি হয়, তা ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়।
যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট অনিবার্য হলেও এর নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার মেলা নয়; এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার মিলনমেলা। এ মেলা হয়ে উঠুক নতুন চিন্তা-ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতার সূতিকাগার। বইমেলার পরিবেশ তরুণ লেখক, গবেষক ও পাঠকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের ১০২টি দেশের নাগরিকদের পাঠাভ্যাস নিয়ে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বই পড়ায় শীর্ষে অবস্থান করছেন। তালিকার সর্বনিম্নে রয়েছে আফগানিস্তান। ওই তালিকায় ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। বাংলাদেশের একজন মানুষ গড়ে বছরে প্রায় তিনটি বই পড়েন এবং বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন বছরে মাত্র ৬২ ঘণ্টা। এ পরিসংখ্যান আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, অমর একুশে শুধু একটি দিবস নয়; এটি আত্মত্যাগ, ভাষা ও সংস্কৃতির গৌরবের প্রতীক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা প্রতি বছর অমর একুশে পালন করি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখন সারা বিশ্বে এ দিবস পালিত হচ্ছে। ভাষা শহীদদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই বাংলা একাডেমি কাজ করে যাচ্ছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন অমর একুশে বইমেলা।
প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব দেন, ভবিষ্যতে অমর একুশে বইমেলাকে আন্তর্জাতিক বইমেলায় রূপ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বইমেলা হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং বহু ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এটি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্র তৈরি করবে।
তিনি বলেন, বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের যুগে মাতৃভাষার পাশাপাশি একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
বইমেলাকে সারাবছরের কার্যক্রমে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় আয়োজন করা যেতে পারে। এতে পাঠাভ্যাস বাড়বে এবং স্থানীয় লেখক-প্রকাশকদেরও উৎসাহিত করবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় বই প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি। তরুণ-তরুণীদের মেধা বিকাশে বাংলা একাডেমি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে—যেমন গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা হয়ে উঠুক সবার মিলনমেলা, প্রাণের মেলা। জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে—এটাই তার প্রত্যাশা।
আকাশজমিন /
আরআর