অনলাইন রিপোর্টার
দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় ঈদের পরদিন থেকে যানবাহন চালকরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। অনেক জেলায় ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও থাকলেও তা সীমিতভাবে। এর ফলে চালকরা তেল কিনতে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং কখনও কখনও সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের মধ্যে ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৪৩টি বন্ধ রাখা হয়েছে। কুড়িগ্রামে জেলার ২০টি স্টেশনের প্রতিটি জ্বালানি ‘তেলশূন্য’, ফলে গ্রাহকরা তেল কিনতে গিয়ে ফেরত যাচ্ছেন। এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার যানবাহন চালক ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ফিলিং স্টেশন মালিক ও কর্মচারীরা জানান, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক পেট্রল যাচ্ছে। অকটেনের সরবরাহ নেই, তবে ডিজেল পাচ্ছেন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গ্রাহক। তেলের সরবরাহ না থাকায় ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার অভিযোগও উঠেছে। অধিকাংশ পাম্পে কার্যক্রম বন্ধ রাখার পেছনে এ কারণটাই কাজ করছে।
রাজশাহী জেলায় ৪৪টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ রয়েছে। বাকি পাম্পগুলোতেও তেলের সংকট চলমান। জেলার গণমাধ্যমকর্মী মাহী ইলাহি জানান, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তিনি জেলার ২০টি পাম্প ঘুরেছেন, কোথাও তেল পাওয়া যায়নি। পাম্পগুলোতে কিছু তেল থাকলেও তা বিক্রি করা হচ্ছে না, ডিপো থেকে আনা তেল মজুত করা হচ্ছে দাম বাড়ানোর জন্য।
রাজশাহী জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান শিমুল বলেন, “পাম্পগুলোতে যা মজুত ছিল তা ঈদের আগেই শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত কোন পাম্পে পেট্রল বা অকটেন পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা এসে পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন। অতিরিক্ত ভিড় ও তেলের সংকটের কারণে পাম্পগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বাঘাবাড়ি ডিপোতে লরি পাঠানো হয়েছে, তবে তেল চাহিদার তুলনায় কম এসেছে। লরিতে ১৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা পেয়েছেন মাত্র তিন হাজার লিটার। ফলে পাম্পগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। শিমুল আরও দাবি করেন, পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন না হলে তেল বিক্রি শুরু করলে বিশৃঙ্খলা হতে পারে।
পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের চালকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঈদের আগের রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হানিফ ফিলিং স্টেশনে ভবনের কাচ ভাঙচুর করা হয়। গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন, তেল থাকলেও পাম্পমালিকেরা তা বিক্রি করছেন না, দাম বাড়ানোর জন্য মজুত রাখছেন। সিন্ডিকেট করে খুচরা পাইকারদের তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, আর ছোট বাজারে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পঞ্চগড়-দিনাজপুর মহাসড়কের ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁও পর্যন্ত ২৫টি স্টেশন বন্ধ। বীরগঞ্জ থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২১টি স্টেশনের মধ্যে তিনটিতে শুধুমাত্র পেট্রল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। মোটরসাইকেল বা বোতল নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো চালকরা তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। ভিড় বেশি হলে হইহুল্লোড়, চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়।
ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপক ও কর্মচারীরা জানান, প্রতিটি লরিতে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের জন্য তিনটি চেম্বার থাকে। ডিপো থেকে শুধু ডিজেল পেয়েছেন, বাকি দুটি চেম্বার খালি। ফলে পরিবহন খরচও বাড়ছে। পাম্পগুলোয় দৈনিক পেট্রলের চাহিদা ৭০০ থেকে দেড় হাজার লিটার, অকটেন ৩৫০ থেকে ৭০০ লিটার, আর ডিজেল দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার। ঈদের আগে অর্ধেক তেল পেয়েছিলেন, তাতেও সংকট কাটেনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী জানান, শুক্রবার কিছু তেল পেয়েছেন, তবে তা কয়েকদিন পরই শেষ। এখন রেশনিং পদ্ধতিতে প্রতিজন ২০০ টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। ভিড়ের কারণে এ ব্যবস্থা ছাড়া উপায় নেই। পঞ্চগড় ধাক্কামাড়া এলাকার একটি পাম্পের কর্মচারী ফারুক আলম জানান, অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি যানবাহন থাকলেও তেল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ছোট পরিমাণের তেলও বেশি চাওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামের অনেক পাম্পে তেল নেই। কিছু পাম্প বন্ধ, কেউ ডিজেল পাচ্ছেন না আবার কেউ অকটেন পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৮৩টি পাম্প, ৭৯ জন এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর ও ২৫৫ জন প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪৬টি পাম্পে ডিজেল থাকলেও অকটেন নেই এবং অকটেন থাকলেও ডিজেল নেই। তবে মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ময়মনসিংহে বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন ঈদের দিন সকাল থেকেই বন্ধ। নগরীর পুলিশ লাইন সংলগ্ন সাইফুল ফিলিং স্টেশন ঈদের দিন সকাল থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। চুরখাই রওশন ফিলিং স্টেশন ঈদের আগের দিন থেকে বন্ধ। শিকারিকান্দা সওদাগর ফিলিং স্টেশন সোমবার দুপুরে খুলে যানবাহন চালকদের তেল দিয়েছে, তবে মজুত শেষ হলে বন্ধ হয়েছে।
বগুড়ার ৭২টি পাম্পের মধ্যে ৩৫টি বন্ধ। ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি মিজানুর রহমান রতন জানান, কিছু জ্বালানি আসার সঙ্গে সঙ্গে সংকট কিছুটা লাঘব হবে।
রংপুরে ৪০টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে অন্তত ২০টি পাম্প বন্ধ। মালিকরা ডিপো থেকে তেল না পাওয়ায় বিক্রি করতে পারছেন না। খুলনায় ৩৬টি পাম্প রয়েছে, চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় সবগুলো পাম্প সংকটে রয়েছে। ব্যাংক বন্ধ থাকায় ড্রাফটের কারণে তেল সরবরাহ সময়মতো হয়নি।
বরিশালে প্রায় ১০০টি পাম্পে তেলের সরবরাহ সীমিত। অধিকাংশ পাম্প দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। তেল না থাকলে গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং পাম্পের কর্মচারীদের ওপর আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে পাম্পগুলো দিনের বাকি সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে।
দেশজুড়ে তেলের সংকট ক্রমেই গুরুতর রূপ নিচ্ছে। চালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের তদারকি দাবি করা হচ্ছে। পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যানবাহন চলাচল ও দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি অব্যাহত থাকবে।