ঢাকার মগবাজারের বিশাল সেন্টারে অবস্থিত পোশাকের দোকান ‘নবীন ফ্যাশন’ ২৪ মার্চ রাতের ঘটনা ঘিরে জাতীয় ও সামাজিক মিডিয়ায় সরগরম হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক এনামুল হাসান নবীন অভিযোগ করেছেন, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হুমকির কারণে তিনি বাধ্য হয়ে দেশের বাইরে চীন চলে গেছেন।
তিনি বলেন, কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি করা এবং বিশেষ ‘চমকপ্রদ অফার’ দেওয়ার কারণে কিছু ব্যবসায়ী ও বাইকারদের সমিতি বিশৃঙ্খলা তৈরি করে দোকান বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কেউ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান, আবার কেউ ঘটনাটিকে সন্দেহজনক বলে আখ্যায়িত করেন।
ঘটনাটি নজরে আসে আদালতেরও। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান স্বপ্রণেদিত হয়ে দোকান খোলার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পুলিশের উপস্থিতিতে দোকান বন্ধ করার ঘটনায় হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মর্তুজাকে কারণ দর্শাতে বলা হয়।
কম দামে পাঞ্জাবি ও চমকপ্রদ অফার
নবীন ফ্যাশন পাঞ্জাবি বিক্রি করে তিনটি মূল্যে—৯৯০ টাকা, ১,৫০০ টাকা এবং ৩,৯৯০ টাকায়। দেশের অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে কম দাম। তাদের ফেসবুক পেজে ৬ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে।
ঈদুল ফিতরের আগে, ২০ মার্চ, নবীন ফ্যাশনের ফেসবুক পেজে দুটি চমকপ্রদ অফার দেওয়া হয়। একটির শর্ত ছিল, ‘৯৯০ টাকার দুটি পাঞ্জাবি কিনলে চারটি ফ্রি’, এবং মোটরসাইকেল নিয়ে আসা ক্রেতাদের জন্য অ্যারাবিয়ান ইঞ্জিন অয়েল বিনামূল্যে দেওয়া হবে। রিকশায় আসা ক্রেতাদের জন্য রিকশা ভাড়াও দেওয়া হবে।
অন্য পোস্টে বলা হয়েছিল, ‘৩,৯৯০ টাকার একটি কাবুলি পাঞ্জাবি সেট কিনলে দুটি কাবুলি পাঞ্জাবি সেট ফ্রি দেওয়া হবে’। এই অফারটি ঈদের বাজারে বিপুল ক্রেতা আকর্ষণ করে।
নবীন ফ্যাশনের বিশাল সেন্টার শাখার ব্যবস্থাপক সারোয়ার আল ফায়সাল জানান, প্রথম দিকে তারা প্রতিশ্রুত অনুযায়ী ইঞ্জিন অয়েল এবং রিকশা ভাড়া প্রদান করেন। কিন্তু ক্রেতাদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। কিছু মোটরসাইকেল চালক মারমুখী হয়ে ওঠে এবং বিপণিবিতানের অন্যান্য ক্রেতা ভীত হয়ে চলে যান। বাধ্য হয়ে নবীন ফ্যাশনের কর্তৃপক্ষ দোকানের সামনের দরজা বন্ধ করেন।
সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়িক বিরোধ
দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এই বিশৃঙ্খলা মূলত চমকপ্রদ অফার এবং ক্রেতাদের অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, বিপণিবিতানটির অন্যান্য দোকানিরা প্রতিবাদ জানায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দোকান বন্ধ করা হয়।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বা অন্য কারও চাপের কারণে দোকান বন্ধ করার বিষয়টি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে সরোয়ার হোসেন উল্লেখ করেন।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দোকান মালিক সমিতির নেতারা এবং পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। একজন নেতা নবীন ফ্যাশনের কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘যে দামে আপনি বিক্রি করেন, পারলে ব্যবসা না করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিলিফ দিয়ে দিন।’
অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, সহসভাপতি মো. মাইকেল ক্রেতাদের সরিয়ে দিচ্ছেন। নবীন ফ্যাশনের মালিক এনামুল তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘সিংহের মতো বাঁচতে চাই, কিন্তু সন্তানদের এতিম করতে চাই না, তাই দেশ ছেড়ে যাচ্ছি।’
দোকান খোলার ও বন্ধ করার পরিস্থিতি
বিপণিবিতানটি দোতলা ভবনে অবস্থিত। নিচতলায় চারটি পোশাকের দোকান, তিনটি দরজির দোকান, একটি দাঁতের সরঞ্জাম বিক্রির দোকান, একটি ইলেকট্রনিকসের দোকান ও মোবাইল অপারেটরের গ্রাহক সেবা কেন্দ্র রয়েছে।
ইলেকট্রনিকসের দোকানের ব্যবস্থাপক রিয়াদ হোসেন প্রথম আলোকে জানান, কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি ও অফারের কারণে দোকান বন্ধ হয়নি। মূল কারণ ছিল মোটরসাইকেলের চালকদের বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তাপ্রহরী ও পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ।
একটি সূত্র জানান, নবীন ফ্যাশন তিন বছর ধরে কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি করছে, পূর্বে কখনো সমস্যা হয়নি। এবার অস্বাভাবিকভাবে বিপুল ক্রেতা উপস্থিত হওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হয়।
মালিকের বিদেশে চলে যাওয়া
নবীন ফ্যাশনের মালিক এনামুলের চীনে দীর্ঘদিনের ব্যবসা ও বাসস্থান রয়েছে। তিনি জানান, ফোনে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি, কারণ পুলিশের কাছে যাওয়ার সময়ই তাঁকে জোর করে দোকান বন্ধ করতে হয়েছিল।
নবীন ফ্যাশনের যাত্রা শুরু ১৯৮৮ সালে। ঢাকায় তাদের ১২টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
ডিএমপির তদন্ত
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ওসি গোলাম মর্তুজা ও সহকারী উপপরিদর্শক আরিফুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্তের পর প্রযোজ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ওসি গোলাম মর্তুজা প্রথম আলোকে বলেন, দোকানের সামনে অতিরিক্ত চাপের কারণে সাময়িকভাবে শাটার বন্ধ হয়। তিনি দোকান মালিক ও সমিতির সঙ্গে বসে বিষয়টি মীমাংসা করার কথা বলেন।
আকাশজমিন / আরআর