আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশের ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অবশেষে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান। এতে করে জাহাজগুলো নিরাপদে আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে গন্তব্যে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) রাজধানী ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী এক সংবাদ সম্মেলনে এ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কাউন্সিল ইতোমধ্যে বাংলাদেশি জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বর্তমানে প্রণালিতে আটকে থাকা ছয়টি বাংলাদেশি জাহাজকে নিরাপদে যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জাহাজগুলো যাতে দ্রুত এবং নিরাপদ পরিবেশে চলাচল করতে পারে সে বিষয়ে ইরান ও বাংলাদেশ সরকার নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, জাহাজে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে ইরানের নৌবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সার্বিক তদারকি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাহাজে থাকা নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই সৌজন্যমূলক পদক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রসঙ্গে কিছুটা অসন্তোষও প্রকাশ করেন। তার মতে, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে কেবল ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। বরং পরিস্থিতির জন্য দায়ী পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে আরও স্পষ্টভাবে ‘নিন্দা’ জানানো প্রয়োজন ছিল বলে ইরান মনে করে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশ ইরানের একটি ঘনিষ্ঠ ও ভাইপ্রতিম দেশ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। যেকোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময় উভয় দেশ একে অপরের পাশে থাকবে—এমন প্রত্যাশাও তিনি ব্যক্ত করেন।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচিত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও পণ্য পরিবহনের জন্য এই প্রণালিটি অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজও সেখানে আটকা পড়ে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। অবশেষে ইরানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি জাহাজগুলোর চলাচলের অনুমতি দেওয়ায় দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কেটে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটি ইতিবাচক প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।