দেশে হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তবে বর্তমানে যারা হামে আক্রান্ত বা জ্বরে ভুগছে, তাদের এই মুহূর্তে টিকা দেওয়া হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
শনিবার (৪ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, দেশের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এবং ধাপে ধাপে দেশের সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, কোনো শিশু আগে হামের টিকা নিয়ে থাকলেও নতুন করে টিকা নেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, পুনরায় টিকা গ্রহণ শিশুর জন্য নিরাপদ। তাই আগের টিকাদান ইতিহাস বিবেচনা না করে নির্ধারিত বয়সসীমার সব শিশুকেই এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যারা অসুস্থ—বিশেষ করে যারা হামে আক্রান্ত বা জ্বরে ভুগছে এবং হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে—তাদের টিকা দেওয়া হবে না। তবে তাদের জন্য বিকল্প হিসেবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
মন্ত্রী জানান, যেসব এলাকায় হামের প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রথম ধাপে ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে। আগামীকাল রোববার থেকে এই কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
তিনি বলেন, “এই ৩০টি উপজেলায় টিকা দিয়েই আমাদের কার্যক্রম শেষ হবে না। আমাদের লক্ষ্য হলো, এই মুহূর্তে দেশে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী যত শিশু রয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই টিকার আওতায় নিয়ে আসা।”
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও ব্যাখ্যা করেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেশব্যাপী যে টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়েছিল, তার পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া অনেক শিশু এখনও হামের টিকা পায়নি। তাই এই বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা হবে।
তিনি বলেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থেকেও কিছু শিশু হয়তো টিকা গ্রহণ থেকে বাদ পড়েছে। আবার যারা টিকা নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও পুনরায় টিকা দেওয়া হলে কোনো ক্ষতি হবে না বলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন।
প্রথম ধাপে যেসব ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি চালু হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাজশাহীর গোদাগাড়ী, ঢাকার নবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, সদর ও শ্রীনগর, ঝালকাঠির নলছিটি, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, সদর ও ফুলপুর, চাঁদপুরের হাইমচর ও সদর, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, সদর, আটঘরিয়া ও বেড়া, নওগাঁর পোরশা, গাজীপুর সদর, নেত্রকোণার আটপাড়া, শরীয়তপুরের জাজিরা, বরগুনা সদর, মাদারীপুর সদর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাটোর সদর এবং যশোর সদর।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব এলাকায় হামের সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে দেশের অন্যান্য উপজেলাতেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সময়মতো টিকা না পেলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবাইকে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা চাই কোনো শিশুই যেন টিকার বাইরে না থাকে। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা দিতে হবে।”
তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দেশের শিশুদের হামের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সরকার এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।