অনলাইন রিপোর্টার
রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব আবারও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দিন-রাত নির্বিশেষে নগরবাসী মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। বাসা, অফিস, রাস্তা কিংবা বাজার—সব জায়গায় যেন মশার রাজত্ব চলছে। এর মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ডিজেলের সংকট। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় মশা মারার প্রধান কার্যক্রম ‘ফগিং’ বা ওষুধের ধোঁয়া ছিটানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও বাস্তবে মশার উপদ্রব কমেনি। উল্টো সাম্প্রতিক সময়ে অনেক এলাকায় মশার আক্রমণ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি অনেক এলাকায় ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
মশা নিধনের অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ফগিং মেশিন ব্যবহার করা হয়। উড়ন্ত মশা দমনে ব্যবহৃত এসব মেশিন পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই ডিজেল সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ৫৪টি ওয়ার্ডে নিয়মিত ফগিং কার্যক্রম চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১১০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেল লাগে। এই চাহিদা পূরণ করতে না পারলে মশা নিধন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিএনসিসির জরুরি ভিত্তিতে প্রায় সোয়া তিন লাখ লিটার এবং ডিএসসিসির প্রায় দুই লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন রয়েছে। এই জ্বালানি সংগ্রহ করতে দুই সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করছেন।
কীটনাশক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, মশা নিধনের ওষুধ তৈরিতে যে মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়, তাতে ডিজেলের অংশই সবচেয়ে বেশি। ‘ম্যালাথিয়ন ৫% আরএফইউ’ নামের কীটনাশক তৈরির ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ উপাদানই ডিজেল। ফলে ডিজেল না থাকলে কার্যত এই ওষুধ তৈরি করা সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এম আর এন্টারপ্রাইজ জরুরি ভিত্তিতে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৯৬ লিটার ডিজেল সরবরাহের জন্য ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ডিজেল সরবরাহে বিধিনিষেধ থাকায় বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে। তারা মশা নিধনের ফগিং কার্যক্রম চালু রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কাছে জরুরি ভিত্তিতে দুই লাখ লিটার ডিজেল বরাদ্দ চেয়েছে।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিপিসি চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে রাজধানীতে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও জ্বালানি সরবরাহে বিলম্ব হলে মশা নিধন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ ডিজেল মজুত আছে, তা দিয়ে চলতি মাসের কার্যক্রম কোনোভাবে চালানো সম্ভব হতে পারে। তবে নতুন করে সরবরাহ না পেলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তাও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, গত এক দশকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে মশা নিধনে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে দুই সিটি কর্পোরেশন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরেও মশা নিয়ন্ত্রণে মোট ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ডিএনসিসি ১১০ কোটি টাকা এবং ডিএসসিসি ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে অতীতে বিভিন্ন অভিনব উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। জলাশয়ে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ ছাড়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও ঢাকার মশার সংখ্যা কমেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, পানি জমে থাকা জায়গা পরিষ্কার রাখা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ফগিং করা হয় না। ফলে মশার উপদ্রব ক্রমেই বাড়ছে।
বাসাবো এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই মনে হচ্ছে মশা বাড়ছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের ওষুধ ছিটাতে খুব একটা দেখা যায় না। দিন-রাত কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সন্ধ্যার পর মশার অত্যাচার ভয়াবহ হয়ে যায়। বাসায় ছোট বাচ্চা থাকায় কয়েল ব্যবহার করা যায় না, তাই প্রায় সারাদিনই মশারির মধ্যে থাকতে হয়।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো—গত প্রায় দেড় বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনে কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর নেই। ফলে তদারকির ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু ওষুধ প্রয়োগ করে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। শহরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নাগরিকদের সচেতন হওয়াও জরুরি।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, মশা নিধন কার্যক্রমে কোনো ধরনের শিথিলতা বরদাশত করা হবে না। কোথাও মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বারবার সতর্ক করার পরও অবহেলা করলে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। শুধু সিটি কর্পোরেশনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। নাগরিকদেরও নিজ নিজ বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজেলের সংকট দ্রুত সমাধান না হলে মশা নিধন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। আর তাতে নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোটি কোটি টাকা ব্যয় ও নানা উদ্যোগের পরও যখন মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তখন নগরবাসী এখন বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধানের অপেক্ষায়।
আকাশজমিন / আরআর