অনলাইন রিপোর্টার
বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্ম বা নির্ধারিত পোশাক আবারও পরিবর্তনের উদ্যোগকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে পোশাক পরিবর্তনের এই উদ্যোগে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে।
সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে ২০০৪ সালে সর্বশেষ ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রায় ২১ বছর পর নতুন করে আনা ‘আয়রন (লোহা) রঙের’ পোশাক মাঠপর্যায়ে চালু করা হয় গত বছর ২৫ নভেম্বর থেকে। তবে এখনো সব সদস্য নতুন পোশাক পাননি।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়। সংগঠনটি দাবি করে, নতুন পোশাক নির্ধারণে পুলিশ সদস্যদের মতামত, গায়ের রং, আবহাওয়া এবং বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। একই সঙ্গে ইউনিফর্মের সঙ্গে অন্যান্য বাহিনীর পোশাকের মিল থাকায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে পুলিশের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিজন সদস্য বছরে পাঁচ সেট পোশাক পান। নতুন পোশাক চালুর পর মাঠপর্যায়ে কিছু ইউনিটে এটি ব্যবহার শুরু হলেও জেলা পর্যায়ের অনেক পুলিশ এখনো আগের পোশাকেই রয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫১ কোটি টাকার এবং অন্যটি প্রায় ২৫ কোটি টাকার কাজ পায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পোশাকের জন্য নির্ধারিত রং ছিল ‘লোহা (আয়রন) রঙ’। তবে এর পাশাপাশি খাকি, নেভি ব্লু এবং আকাশি শার্টসহ বিভিন্ন রঙের পোশাকের প্রস্তাবও বিবেচনায় আনা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি পাঁচ ধরনের রঙের পোশাক প্রদর্শন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাঁচজন কনস্টেবলকে বিভিন্ন রঙের পোশাক পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাজির করা হয়। সেখানে খাকি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট, খাকি শার্ট ও খাকি প্যান্ট, নেভি ব্লু শার্ট-প্যান্ট, আয়রন রঙের পোশাক এবং আকাশি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট—এই পাঁচ ধরনের ইউনিফর্ম উপস্থাপন করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বারবার পোশাক পরিবর্তনের সুযোগ নেই, কারণ এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় ধরনের অপচয়ের ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পোশাক নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, নতুন ইউনিফর্মের রং ও ডিজাইন নিয়ে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ ট্রল ও ব্যঙ্গের কারণে মানসিকভাবে বিব্রত বলেও জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের কাজ শুরুর পর ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশসহ (ডিএমপি) বিভিন্ন মহানগর পুলিশ ও বিশেষায়িত ইউনিটে নতুন পোশাক ব্যবহার শুরু হয়। তবে জেলা পুলিশ পর্যায়ে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।
এদিকে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। র্যাবের জন্য জলপাই (অলিভ) রঙ এবং আনসারের জন্য সোনালি গমের (গোল্ডেন হুইট) রঙ নির্ধারণ করা হলেও এসব পরিবর্তন এখনো কার্যকর হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বারবার পোশাক পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এক বছর না যেতেই আবার পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা উচিত। তার মতে, পোশাক পরিবর্তনের চেয়ে পুলিশের সেবার মান ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৩ লাখ মিটার কাপড় সরবরাহ করা হয়েছে। তবে নতুন নির্দেশনার কারণে আপাতত কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। নতুন ডিজাইন চূড়ান্ত হলে সেই অনুযায়ী উৎপাদন চালানো হবে।
সব মিলিয়ে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তনকে ঘিরে এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন করে পর্যালোচনা চলছে। একদিকে আধুনিকায়নের দাবি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ব্যয়ের চাপ—এই দুইয়ের ভারসাম্য নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।