ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ইউনূস সরকারের হেঁয়ালিপনা: স্বাস্থ্য খাতে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা


  • আপলোড সময় : শনিবার ১১ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৪:০৪ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি স্থগিত হয়ে যাওয়ায় দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ইতোমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাবসহ কিছু রোগের পুনরুত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ বা স্থবির থাকলে আগামী দিনে শিশুস্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে কর্মসূচি স্থবিরতা ও উদ্বেগ

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রণীত অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করার পর থেকে দীর্ঘদিনের সফল রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিগুলো ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন, কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ, ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, পাশাপাশি সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কর্মসূচি শুধু পৃথক প্রকল্প নয়, বরং জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি ধারাবাহিক কাঠামো। এগুলো ব্যাহত হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, অপারেশনাল প্ল্যান বাতিলের ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছে এবং এর প্রাথমিক প্রভাব ইতোমধ্যে রোগের পুনরুত্থানের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়েছে।

শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধাক্কা

শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব কার্যত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে বছরে দুইবার এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো।

কিন্তু ২০২৫ সালে এই কার্যক্রম কমিয়ে একবারে নামিয়ে আনা হয়, যা বিশেষজ্ঞরা শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের পশ্চাৎপদতা হিসেবে দেখছেন।

একইভাবে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও শিশুদের অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হতো।

স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে পথশিশু পর্যন্ত এই কার্যক্রমের আওতায় থাকত। কিন্তু বর্তমানে এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণ পুনরায় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কৃমিতে আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা। তাই এই কর্মসূচির স্থবিরতা সরাসরি শিশুস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অর্জন হারানোর শঙ্কা

গত এক দশকে বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়। বিশেষ করে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সফলতা আসে।

২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের হার ৮০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৯৬ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে এই কর্মসূচির কার্যক্রম স্থগিত থাকায় সেই অর্জন এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

দেশের ১৩টি জেলা এখনো ম্যালেরিয়াপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। ২০২৩ সালে এসব এলাকায় ১৬ হাজার ৫৬৭ জন আক্রান্ত হয় এবং ৬ জনের মৃত্যু ঘটে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মশারি বিতরণ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে পারে।

একইভাবে কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের ধারাবাহিকতায় প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবারও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একবার তা ব্যাহত হলে অর্জিত সাফল্য দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে।

ডেঙ্গু ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি

চলতি বছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চলতি বছরের শুরু থেকেই তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

গত বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জলাবদ্ধতা এবং সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করতে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

অপারেশনাল প্ল্যান বাতিল: কাঠামোগত সংকট

স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিলের সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা এই সেক্টরভিত্তিক কর্মসূচি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করত।

এর মাধ্যমে টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, রোগ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন একসঙ্গে পরিচালিত হতো।

কিন্তু ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের স্বাস্থ্য পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি (এইচএনপিএসপি) বাতিল করে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি।

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাদ দিয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পে যাওয়ার ফলে পুরো ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে হামের মতো নিয়ন্ত্রিত রোগে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, যথাযথ জরিপ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পাঁচ বছরের ধারাবাহিক কর্মসূচি ছাড়া সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এতে রোগ বাড়বে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়বে।

সরকারের প্রস্তুতি

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে শিশুদের হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, হাম বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার-পাঁচ মাস বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে এবং ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক কার্যক্রম চালু রাখা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, এসব সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সামনে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক কর্মসূচি পুনরায় চালু করা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।



এ সম্পর্কিত আরো খবর