সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এ অনিয়মের নেপথ্যে রমজান খান ও মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তীতে নির্বাচন ছাড়াই পূর্ববর্তী সময়ে প্রভাব বিস্তারকারী রমজান কমিটি পুনরায় সক্রিয় হয়। এতে সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে থাকা রমজান খান তার ঘনিষ্ঠ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাইকেল মহিউদ্দিনকে সামনে নিয়ে আসেন। গত ১২ জানুয়ারি নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়, যেখানে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্টার খন্দকার জামিলুর রহমানকে সভাপতি করা হলেও কার্যত নিয়ন্ত্রণে ছিলেন অন্যরা—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মহাসচিবের দায়িত্ব নিয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন সাব-রেজিস্ট্রারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন নিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। সাব-রেজিস্ট্রারদের একটি অংশের ভাষ্যমতে, এসব পদায়নে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ‘বদলি সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত রমজান খানের প্রভাবের কারণে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ সরব হতে পারেননি। সরকার পরিবর্তনের পরও আন্দোলনের আশঙ্কা দেখিয়ে এবং পরে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত থাকে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, নতুন কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করে তা মাইকেল মহিউদ্দিনের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হতো। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই একাধিকবার বদলি হয়ে পছন্দের স্থানে পদায়ন পেতেন। এমনকি পদে টিকে থাকতে মাসিক ভিত্তিতেও অর্থ প্রদানের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ঢাকার গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন স্থানে এই বদলি সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অডিও রেকর্ড থাকার দাবিও করা হয়েছে, যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কমিটির বিভিন্ন সদস্য এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লোভনীয় পদায়ন পেয়েছেন। যেমন—গোলাম মোস্তফা, জাহাঙ্গির আলম, মামুন বাবর মিরোজ, মো. আব্দুল বাতেন, আদনান নোমান, সাজ্জাদ হোসেনসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে গত বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন। আবেদনের সঙ্গে ‘৮ মাসে ঘুষ লেনদেন শতকোটি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের স্থানে পদায়ন পেয়েছেন। জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো তদন্তসাপেক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর নির্ভরশীল।
আকাশজমিন / আরআর