যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে বড় চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ চাচ্ছে সরকার, যা আগামী চার মাসের জ্বালানি ও সার আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকায়, যেখানে বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৫৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠির সঙ্গে একটি বিস্তারিত অবস্থানপত্রও পাঠানো হয়েছে, যেখানে যুদ্ধজনিত কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
অবস্থানপত্রে বলা হয়েছে, এই ৩০০ কোটি ডলার ঋণ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ে জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া। তৃতীয়ত, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং বিষয়টি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সভায় তুলে ধরা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রায় ২৫০ শতাংশ, এলএনজির দাম ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য চাপে পড়েছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে জ্বালানি ও সার আমদানিতে ব্যয় ৩০১ কোটি ডলার থাকলেও চলতি বছরে একই সময়ে তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে জ্বালানি খাতে ৫১৪ কোটি ডলার এবং সার আমদানিতে ২৬২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেমন বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল, এবারও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একই ধরনের চাপ তৈরি করছে। তখন ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং দেশে মূল্যস্ফীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি কার্যত অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই অনিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আবার চাপের মধ্যে পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও মার্চে তা কমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
সরকার বলছে, এই ঋণ বাজেট সহায়তা হিসেবে নেওয়া হবে এবং তা স্বল্পমেয়াদি ও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে ব্যবহার করা হবে। তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো সাধারণত জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বিরোধিতা করে থাকে, ফলে নতুন ঋণ পেতে সংস্কার ও শর্ত নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই চাপ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং তা মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক দেশই বাজেট সহায়তা নিচ্ছে, তাই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। তবে নীতি সংস্কার ও জ্বালানি মূল্য সমন্বয় নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রশ্ন থাকতে পারে।