দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশু মৃত্যুর সংখ্যাও। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে টিকার দুই ডোজ না পাওয়াই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা ব্যবস্থাপনায় কোথায় ত্রুটি বা অবহেলা ছিল, টিকার ঘাটতি কেন তৈরি হলো—এসব বিষয় দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতেও এমন প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি দুইজনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গজনিত কারণে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৫ জন শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে ১২৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ৯৮৮ জন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ২১১ জন। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে ২১ হাজার ৪৬৭ জন। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৯৮ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯২ জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জন্য জন্মের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ (মিজেলস) এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই ডোজ সময়মতো দেওয়া হলে হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা কেনা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অবহেলা ও খামখেয়ালিপনার অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দে অনীহা এবং সময়মতো টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, টিকা কার্যক্রম শিশুদের জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় নির্ধারণ করা জরুরি। টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ বা বাজেট বরাদ্দে যারা অবহেলা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ জানান, বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা বেশি। কারণ তারা নির্ধারিত সময়ের আগে ঝুঁকিতে পড়ছে এবং এখনও টিকার আওতায় আসেনি। ফলে তারা সহজেই সংক্রমণের শিকার হচ্ছে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক বলেন, টিকার ঘাটতি এবং সময়মতো সরবরাহ না পাওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। তিনি মনে করেন, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত ছিল, কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হামের সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।