স্টাফ রিপোর্টার:
ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমরা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার বগুড়ায় একাধিক কর্মসূচি ও জনসভায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। পৈতৃকভিটা সফরকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ছিল কড়া নিরাপত্তা ও ব্যাপক জনসমাগম।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো পৈতৃকভিটা বগুড়ায় সফর করেন তারেক রহমান। সোমবার সকাল সাড়ে ৬টায় তিনি ঢাকার গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসা থেকে সড়কপথে উত্তরের উদ্দেশে রওনা হন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সকাল ১০টার দিকে তিনি বগুড়া সার্কিট হাউজে পৌঁছান।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, পুরো সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় ব্যস্ত সময় পার করেন। সফরসূচির মধ্যে ছিল ই-বেইলবন্ড, সিটি করপোরেশন উদ্বোধন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, খাল খনন কার্যক্রম এবং হামের টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। এছাড়া তিনি গাবতলীর পৈতৃকভিটা ‘জিয়াবাড়ি’ পরিদর্শন করেন।
দুপুরের পর বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে তিনি মঞ্চে উপস্থিত হলে হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থক করতালির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
বিকালে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় প্রধান বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। তার ভাষায়, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে এবং পরবর্তীতে দেশবাসীর সামনে তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই জুলাই সনদের প্রত্যেকটি শব্দ, প্রত্যেকটি অক্ষর তারা বাস্তবায়ন করবে।
তিনি বলেন, “কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এই কথা বলার পরেও আমরা দেখছি কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলছে।”
তারেক রহমান আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি কমিশন গঠন করেছিল, যার মধ্যে সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, স্বাস্থ্য এবং নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত কমিশন রয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আজ ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমরা।”
তার বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, যারা সংস্কার নিয়ে বেশি কথা বলছে, তারা জনগণের প্রকৃত সমস্যার বিষয়ে কথা বলছে না। তার অভিযোগ অনুযায়ী, তারা নারীর উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সহজীকরণ, ওষুধ প্রাপ্তি, প্রশাসনিক সংস্কার কিংবা আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলছে না, বরং শুধু সংবিধান বিষয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছে।
তিনি বলেন, “কীভাবে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে, কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে—সেই বিষয়ে তারা কথা বলে না, তারা শুধু সংবিধান নিয়েই কথা বলে।”
জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সাম্প্রতিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, একটি এলাকায় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ঘটে যাওয়া একটি তুচ্ছ পারিবারিক ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তার ভাষায়, “একটি পারিবারিক, একটি ব্যক্তিগত ঘটনাকে কারা রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, আপনারা দেখেছেন।”
বিকাল পৌনে ৫টায় প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে ওঠার পর থেকেই পুরো মাঠ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। হাজারো মানুষ হাত নেড়ে ও স্লোগান দিয়ে তাকে অভিবাদন জানায়। জনসভাস্থল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ এবং আশপাশের সড়কগুলোতেও নেতাকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
দুপুর থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা জনসভাস্থলে আসতে শুরু করেন। বিকাল ৩টার মধ্যেই পুরো আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মাঠের বাইরে প্রধান সড়কগুলোতেও জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে।
বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে অবস্থিত পৈতৃকভিটা ‘জিয়াবাড়ি’ পরিদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন। এরপর তিনি জনসভাস্থলে এসে বক্তব্য দেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি পরে বাইতুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদ এবং বগুড়া প্রেসক্লাব ভবনের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন বলে জানা গেছে।
সফরকে ঘিরে বগুড়া শহর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো এলাকায় কঠোর নজরদারি বজায় রাখে। জনসভা ও অন্যান্য কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যান চলাচলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বগুড়ায় এই সফর ও জনসভা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক বিভ্রান্তি নিয়ে দেওয়া বক্তব্য আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ছিল ব্যস্ত, রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং জনসমাগমে পরিপূর্ণ। দিনশেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলে পুরো কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
আকাশজমিন / আরআর