দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনাগ্রহ এবং ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে বহুপক্ষীয় সমন্বিত কমিটি গঠনসহ যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছিল, তার বেশির ভাগই এখনো কার্যকর হয়নি, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একটি যৌথ সভায় টিকাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি নাইট্যাগ-এর চেয়ারপারসন ফিরদৌসী কাদরীর সভাপতিত্বে বিশেষজ্ঞরা হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করেন। সুপারিশ অনুযায়ী শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ, ল্যাব বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করার কথা বলা হয়। এই কমিটির কাজ হওয়ার কথা ছিল রোগ শনাক্তের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো কমিটি গঠিত হয়নি।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শমূলক কমিটি ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন (এনভিসি)–এর বিষয়েও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে। ২০১৭ সালে গঠিত এই কমিটি দেশের হামের পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এরপর ৫ এপ্রিল থেকে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও সমন্বয়হীনতার কারণে পুরো কর্মসূচি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ১২ এপ্রিল চারটি সিটি করপোরেশনে টিকা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলেও পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, অনেক পদক্ষেপ আগেই নেওয়া হয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা সম্ভব হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী আলাদা সমন্বয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তারা জানান।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তাদের মতে, রোগ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সিদ্ধান্ত, তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর তদারকি না থাকলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
একজন জনস্বাস্থ্যবিদ জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান ও রোগী ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি অনুপস্থিত।
এদিকে হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়ছে। রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে বলে জানা গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং সচেতনতার ঘাটতিই এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে হামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তারা স্বাস্থ্য প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তদারকি এবং জরুরি ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা নয়, বরং একটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে, যা নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।