স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার চালুর মাধ্যমে রাজধানীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছিল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড। তবে বাস্তবে এই প্রযুক্তিই এখন গ্রাহকদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবহার অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল নির্ধারণ ও তাৎক্ষণিক ব্যালেন্স দেখানোর কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মিটারগুলো ভুল তথ্য দেখাচ্ছে, অস্বাভাবিকভাবে টাকা কেটে নিচ্ছে এবং ব্যালেন্সের হিসাবেও অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, স্মার্ট মিটারে কখনো হঠাৎ করে ব্যালেন্স কমে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। প্রি-পেমেন্ট সিস্টেম অনুযায়ী আগে টাকা রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক মিটার সেই নিয়ম অনুসরণ করছে না। এতে ব্যবহারকারীদের অজান্তেই বিল জমে যাচ্ছে এবং পরে তা বকেয়া হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা গ্রাহকদের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের সমস্যা প্রায় নিয়মিত ঘটছে। কেউ বলছেন, রিচার্জ করার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যালেন্স অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে, আবার কেউ বলছেন নির্দিষ্ট ব্যবহার না করেও বিল বেড়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে অভিযোগ জানানো হলেও দ্রুত সমাধান মিলছে না বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার এক বাসিন্দা জানান, তিনি ২ হাজার টাকা রিচার্জ করার পর এক দিনের ব্যবধানে ব্যালেন্স নেমে আসে মাত্র কয়েকশ টাকায়। এরপর ধীরে ধীরে সেটি আরও কমে যায়। মোবাইল অ্যাপে ভিন্ন তথ্য দেখালেও মিটারের ডিসপ্লেতে তথ্যের মিল নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্যদিকে অনেকেই বলছেন, হঠাৎ বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেলে মিটার লক হয়ে যায় এবং তখন বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারাও। অনেক গ্রাহক জানান, অভিযোগ করার পর বিদ্যুৎ অফিস থেকে লোক এসে সাময়িকভাবে ঠিক করে দিলেও কিছুদিন পর আবার একই সমস্যা ফিরে আসে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা কমে যাচ্ছে এবং ক্ষোভ বাড়ছে।
শুধু প্রি-পেমেন্ট মিটারই নয়, কিছু পোস্ট-পেইড মিটারেও অতিরিক্ত ও ভুল বিলের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর জিগাতলার এক বাসিন্দা জানান, তার নিয়মিত বিল যেখানে প্রায় ১২০০ টাকা আসে, সেখানে এক মাসে প্রায় তিন গুণ বেশি বিল ধরা হয়। পরে আপত্তি জানালে সেটি সংশোধন করা হয়। তবে আপত্তি না তুললে অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতে হতো বলেও তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার মূল কারণ হলো প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাব। স্মার্ট মিটার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পুরোপুরি কার্যকর না করেই মাঠ পর্যায়ে মিটার বসানো শুরু করা হয়েছে। ফলে ডাটা প্রক্রিয়াকরণে ভুল হচ্ছে এবং গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ভুল তথ্য যাচ্ছে।
এছাড়া নেটওয়ার্ক সমস্যাও বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্মার্ট মিটারগুলো নিয়মিত সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলে ব্যালেন্স আপডেটে গরমিল দেখা দেয়। এতে কখনো বেশি, কখনো কম টাকা কাটা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে। তিনি জানান, কিছু মিটার ঠিকভাবে কাজ করছে না এবং সিস্টেমেও ঘাটতি রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে এসব সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটও দেখা দিয়েছে। কয়েক লাখ স্মার্ট মিটার দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে আছে, যা সময়মতো স্থাপন না হলে বিকল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে বিপুল অর্থের সরকারি বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই ধীরগতি, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি এবং সমন্বয়হীনতার কারণে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, মেয়াদ বাড়ানো ও অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সঠিক প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ছাড়া এমন বড় প্রকল্প চালু করলে শুধু অর্থ অপচয়ই নয়, গ্রাহকের আস্থাও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।