রাজধানীর নিম্ন আদালত পাড়ায় সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রের (লিগ্যাল এইড) সামনে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন নানা সমস্যায় পড়া মানুষ। তবে এই ভিড়ের বড় অংশই নারী—যাদের অধিকাংশই পারিবারিক সহিংসতা, ভরণপোষণ না পাওয়া কিংবা বৈবাহিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো জটিল পরিস্থিতির শিকার। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, এই দপ্তরে আসা মোট সেবাগ্রহীতাদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী, যা সমাজে নারীদের আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তব সংকটের চিত্র স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
চাঁদপুর থেকে এসে সকাল থেকেই লিগ্যাল এইড অফিসের সামনে বসে আছেন লিলি বেগম। কোলে ছোট্ট সন্তান, আরেক সন্তানকে রেখে এসেছেন নানির কাছে। তার সঙ্গে আছেন আরও দুই নারী। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি জানান, স্বামী শেখ সাজু আহমেদের সঙ্গে তার ৮ বছরের সংসার। দুই সন্তানের জননী হলেও বর্তমানে স্বামী তার কোনো খোঁজখবর নেন না, এমনকি ভরণপোষণও দেন না। এই অবস্থায় দিশেহারা হয়ে তিনি আইনি সহায়তার আশায় এখানে এসেছেন। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ১২টার দিকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সামনে তাকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
লিলি বেগমের মতো আরও অনেক নারী প্রতিদিন এখানে আসেন। কেউ স্বামীর নির্যাতনের শিকার, কেউ আবার পরিত্যক্ত বা প্রতারিত। কামরাঙ্গীচর থেকে আসা এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে আর তার খোঁজ নিচ্ছেন না। আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে আইনি সহায়তা নিতে এসেছেন। তার ভাষায়, “অভাবের সংসার এমনিতেই চলছে কষ্টে। এখন স্বামী অন্য বিয়ে করেছে শুনে একেবারে ভেঙে পড়েছি। কোনো উপায় না পেয়ে এখানে এসেছি।”
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে আইনি পরামর্শ নিতে আসা মোট ৩ হাজার ৪৫৮ জনের মধ্যে ২ হাজার ৬১৩ জনই নারী, যা মোটের ৭৫.৫৬ শতাংশ। পুরুষ সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ৮৩৭ জন, অর্থাৎ ২৪.২০ শতাংশ। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের সেবাগ্রহীতা ছিলেন ৮ জন, যা মোটের ০.২৩ শতাংশ। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, আইনি সমস্যায় পড়া নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সহায়তার জন্য লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
মামলার ধরন বিশ্লেষণ করলে নারীদের অসহায়ত্ব আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এক বছরে জমা পড়া ২ হাজার ১৪২টি মামলার মধ্যে ১ হাজার ৪২৬টি পারিবারিক মামলা, যা মোটের ৬৬.৫৫ শতাংশ। ফৌজদারি মামলা রয়েছে ৩৯৬টি (১৮.৪৮ শতাংশ) এবং দেওয়ানি মামলা ৩২০টি (১৪.৯৪ শতাংশ)। অর্থাৎ প্রতি ১০টি মামলার মধ্যে অন্তত ৭টিই পারিবারিক বিরোধসংক্রান্ত। এসব মামলার বড় অংশই দেনমোহর আদায়, ভরণপোষণ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
তবে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও মামলার জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর) কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে মোট ২ হাজার ৬২টি মামলার মধ্যে ৭৯৯টি মামলাপূর্ব বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া বিচারাধীন ১৩১টি মামলার মধ্যে ৪৪টি আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমে শেষ হয়েছে। এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা সোয়া কোটি টাকার বেশি পাওনা বুঝে পেয়েছেন, যা মূলত নারীদের দেনমোহর ও খোরপোশের অর্থ।
একই বছরে কারাগার থেকে ২ হাজার ৯৬৩ জন কারাবন্দির আইনি সহায়তার আবেদন লিগ্যাল এইড অফিসে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আদালত থেকে আরও ১১৪টি মামলা এই দপ্তরে রেফার করা হয়েছে।
লিগ্যাল এইডের সেবার কার্যকারিতা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। মুন্সিগঞ্জের এক নারী, যিনি একটি বেসরকারি প্রকল্পে কর্মরত, দীর্ঘদিন পারিবারিক সমস্যার কারণে আদালতে ঘুরে অবশেষে লিগ্যাল এইডের সহায়তা নেন। তিনি জানান, মাত্র একটি তারিখেই তার সমস্যার সমাধান হয়েছে। তিনি বলেন, “এখানকার আইনজীবী ও বিচারকরা খুব আন্তরিকভাবে কাজ করেন। তাই আমাদের মতো মানুষ খুব সহজেই সমাধান পাই।”
জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই বলেন, লিগ্যাল এইড এখন মানুষের কাছে একটি ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। এখানে কম সময়ে এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নারীরাই বেশি সেবা নিতে আসেন, কারণ পারিবারিক সমস্যায় তারাই বেশি ভুক্তভোগী হন। তিনি আরও জানান, এখানে মামলার প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে চলমান মামলা এবং কারাগারে থাকা আসামিরাও আইনি সহায়তা পেয়ে থাকেন। এমনকি মামলা ছাড়াই আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়।
আরেক আইনজীবী মো. হাকিম বাহাউল হক বলেন, লিগ্যাল এইডে আসা অধিকাংশ বিরোধ প্রথমেই সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। এরপরও যদি মামলা করতে হয়, তা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখানে নারী, পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সবাই সমানভাবে আইনি সহায়তা পান।
জেলা লিগ্যাল এইডের অফিস সহকারী জুবায়রা ফেরদৌসী জানান, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে তারা সহায়তা দেন, যার মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। দেওয়ানি, ফৌজদারি ও পারিবারিক মামলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হয়। এছাড়া আদালত থেকে প্রাপ্ত মামলাগুলোতেও তারা সহায়তা প্রদান করেন।
জাতীয় আইন সহায়তা দিবসের প্রেক্ষাপটে এই পরিসংখ্যান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—সমাজে নারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম অনেক নারীর জন্য আশার আলো হয়ে উঠছে, যারা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দ্বারস্থ হচ্ছেন এই সেবাকেন্দ্রের।