ব্রাসেলসে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) অনুস্বাক্ষরের পর এবার ঢাকায় রাজনৈতিক সংলাপে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আগামী ২৯ এপ্রিল (বুধবার) অনুষ্ঠিতব্য এই সংলাপকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি গুরুত্ব দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈধ অভিবাসন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যু এই সংলাপে প্রাধান্য পেতে যাচ্ছে।
২৭ দেশের ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এটি হবে পঞ্চম দফার রাজনৈতিক সংলাপ। এতে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। অন্যদিকে ইইউর পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এরিক কুর্জওয়েল। দেড় দিনের সফরে ২৮ এপ্রিল দিবাগত রাতে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সংলাপে বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনীতি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, উন্নয়ন, নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, সুনীল অর্থনীতি, সংস্কার কার্যক্রম, গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিও আলোচনায় উঠে আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ইইউর সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে উভয় পক্ষই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এই সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে সম্প্রতি ইইউর সঙ্গে পিসিএ অনুস্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই সংলাপে চুক্তিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য পরবর্তী করণীয় নির্ধারণেও মতবিনিময় হতে পারে। একই সঙ্গে ইইউ বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে এগোতে আগ্রহী। এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য ইইউকে আহ্বান জানানো হবে। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভিবাসন ইস্যুও সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, ইইউর দেশগুলোতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশিদের যাচাই-বাছাই করে দেশে ফেরত আনার একটি চুক্তি রয়েছে। তবে ফেরত পাঠানোর হার এখনও সীমিত। বাংলাদেশ বৈধ অভিবাসন আরও জোরদার করতে চায় এবং ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি সংলাপে তুলে ধরবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংলাপকে সামনে রেখে গত ২২ এপ্রিল পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলমের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো নিজেদের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো উপস্থাপন করে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে সংলাপের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইইউর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা, শ্রম খাতের উন্নয়ন এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়েও তারা গুরুত্ব দিতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় কোম্পানি থেকে এয়ারবাস কেনার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে বলে জানা গেছে। ইইউ এর আগেও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং সংলাপে বিষয়টি আবারও তুলতে পারে।
সরকারের অবস্থান সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে স্থিতিশীল ও ইতিবাচক। তারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে জানতে চাইবে—এটি স্বাভাবিক। বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের অগ্রগতি তুলে ধরবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়েছে এবং আরও কিছু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অল্প সময়েই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইইউ বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল বাজার। এই সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিসিএ অনুস্বাক্ষর একটি বড় মাইলফলক, যা দুই পক্ষের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এই চুক্তির পরপরই রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজন করা ইইউর আগ্রহেরই প্রতিফলন।
সম্প্রতি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং ইইউর হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাসের উপস্থিতিতে পিসিএ চুক্তির অনুস্বাক্ষর হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম এই চুক্তিতে সই করল।
এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক আরও গভীর ও ভবিষ্যৎমুখী হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। উভয় পক্ষই এটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের নভেম্বরে ২৭ দেশের ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে প্রথম রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করে বাংলাদেশ। ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই সংলাপে বাংলাদেশের পক্ষে তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এবং ইইউর পক্ষে বৈদেশিক কার্যক্রমের উপমহাসচিব এনরিকে মোরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ধারাবাহিক এই সংলাপের মাধ্যমে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও সুসংহত হচ্ছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।