নির্বাচনি এলাকায় দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ জোরদার করতে প্রতিটি উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য অফিস বা ‘পরিদর্শন কক্ষ’ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসন ও প্রশাসনিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলা পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি করে সুসজ্জিত কক্ষ এমপিদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। যেহেতু ব্যক্তিগত নামে সরকারি অফিস বরাদ্দের আইনি সুযোগ নেই, তাই এসব কক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পরিদর্শন কক্ষ’ বা ইন্সপেকশন রুম হিসেবে অভিহিত করা হবে।
এমপিদের দাবি, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন তাদের প্রধান দায়িত্ব হলেও নির্বাচনি এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প তদারকি, দুর্যোগকালীন সহায়তা এবং জনগণের অভিযোগ শোনার জন্য তাদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অফিস না থাকায় কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হয়।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা শোনা এবং উন্নয়ন কাজ তদারকির জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা প্রয়োজন। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে এসব কাজ করা বাস্তবসম্মত নয়। একইভাবে পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক এমপি অধ্যক্ষ শাহ আলমও বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে একটি অফিস থাকা জরুরি।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তাদের মতে, উপজেলা পরিষদে এমপিদের স্থায়ী উপস্থিতি স্থানীয় সরকার কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের ভূমিকা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মারুফুল ইসলাম মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হতে পারে। তিনি বলেন, এটি আইনে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও বাস্তবে কেন্দ্রীয় প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা মো. আসলাম মিয়া বলেন, এই অফিসগুলো একদিকে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু তৈরি করতে পারে, তবে অন্যদিকে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, এই উদ্যোগের ফলে অন্তত তিনটি বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রথমত, দ্বৈত শাসনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমপিরা বর্তমানে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে থাকলেও নিজস্ব অফিস থাকলে তারা কার্যত প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবেন, যা একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক চাপ বাড়তে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের ওপর এমপিদের দাফতরিক প্রভাব বাড়লে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সুশাসন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয়ত, জবাবদিহির সংকট তৈরি হতে পারে। এমপিরা যদি সরাসরি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব খাটান, তাহলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, কিছু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। গলাচিপা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. শাহীন মিয়া বলেন, এতে সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যার কথা সরাসরি জানানোর একটি নির্দিষ্ট স্থান পাবেন, যা জনসেবার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উপজেলা পরিষদ চত্বরে এমপিদের অফিসকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজন বা গ্রুপিং তৈরি হতে পারে, যা প্রশাসনিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে জনসেবা ও সমন্বয়ের যুক্তিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসন কতটা বজায় থাকবে—তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। বিষয়টি বাস্তবায়নের পরই এর প্রকৃত প্রভাব স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।