জাতীয় সংসদের দর্শক গ্যালারিগুলোর নামকরণ করা হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে। একইসঙ্গে সংসদ ভবনের মূল প্রবেশ ফটকের নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নামে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুনভাবে প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরামর্শে এই নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদ ভবনের সঙ্গে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম যুক্ত করা শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধার প্রতিফলন।
জাতীয় সংসদ ভবনের দর্শক গ্যালারিগুলো সাধারণত সংসদ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানে সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ নির্দিষ্ট অনুমতিপ্রাপ্ত দর্শনার্থীরা সংসদের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। এতদিন এসব গ্যালারির নাম ছিল ফুল, নদী এবং প্রাকৃতিক উপাদানের নামে। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বীরশ্রেষ্ঠদের নামে পুনঃনামকরণ করা হয়েছে।
নতুন নামকরণ অনুযায়ী ভিআইপি গ্যালারি-১ এর নাম রাখা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে। ভিআইপি গ্যালারি-২ এর নামকরণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের নামে। এই দুটি গ্যালারি মূলত সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, যেখানে তারা সংসদীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেন।
এছাড়া গ্যালারি-৩ এর নামকরণ করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফের নামে, গ্যালারি-৪ বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের নামে, গ্যালারি-৫ বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশিয়াল মোহাম্মদ রুহুল আমিনের নামে, গ্যালারি-৬ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের নামে এবং গ্যালারি-৭ বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
সংসদের মূল প্রবেশ ফটকের নামকরণ করা হয়েছে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নামে, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। এই নামকরণের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর একটি পরিকল্পনার অংশ। তিনি বলেন, “আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের সম্মানিত করলে আমাদের কী অসুবিধা? জাতীয় সংসদ তাদের ত্যাগের কারণেই প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। এই দেশ স্বাধীন হয়েছে যাদের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে, তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাসকে কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এই নামকরণ সেই চেতনারই প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, সংসদের গ্যালারিতে বীরশ্রেষ্ঠদের নাম যুক্ত হওয়ায় এটি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণার উৎস হবে।
বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের সদস্যরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, অতীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এভাবে বীরশ্রেষ্ঠদের স্মরণ করার উদ্যোগ কম দেখা গেছে। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের নাম যুক্ত হওয়ায় তারা সম্মানিত বোধ করছেন। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার একটি বড় পদক্ষেপ।
সংসদ ভবনের এই গ্যালারিগুলো শুধু দর্শনার্থীদের বসার স্থান নয়, বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাক্ষী হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে সাধারণ মানুষ সংসদের বিতর্ক, আইন প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ফলে এই স্থানগুলো জাতীয় গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বীরদের নাম যুক্ত করা একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি শুধু ইতিহাস স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করার একটি মাধ্যম।
নতুন এই নামকরণের মাধ্যমে সংসদ ভবন আরও বেশি ইতিহাসনির্ভর ও প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন স্থানে পরিণত হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় স্মারক ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণে মুক্তিযুদ্ধের বীরদের অন্তর্ভুক্তি জাতীয় পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করবে।
সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদের এই উদ্যোগকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একদিকে যেমন ইতিহাস স্মরণ করাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও ত্যাগের গুরুত্বও তুলে ধরবে।