টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ৪ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে মাঠের ফসল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই এবং জুড়ি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে ভারতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজান থেকে আরও ঢল নামার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ অবস্থায় ফসল রক্ষায় আগাম পদক্ষেপ হিসেবে সরকার ধান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ৩ মে থেকে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরগুলোকে। চলতি মৌসুমে সিলেট অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদন হয়েছে, যার অধিকাংশই হাওর এলাকায়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানিয়েছেন, নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে মৌলভীবাজারের কিছু নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে হাওরাঞ্চলের হাজার কোটি টাকার আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আগামী শনিবার পর্যন্ত সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
মূলত ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাতের কারণেই সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল নামছে এবং নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবেই বন্যার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, আর কয়েক দিন সময় পেলে তারা ফসল ঘরে তুলতে পারতেন। কিন্তু আগাম বন্যার আশঙ্কায় তাদের সেই স্বপ্ন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। অনেকেই ইতোমধ্যে দ্রুত ফসল কাটার চেষ্টা করছেন।
এদিকে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। জানমাল ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিলেটের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা বলেন, আগামী ৩ মে থেকে ধান কেনার নির্দেশনা পাওয়া গেছে। যদিও এখনো পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি, তবে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সিলেটের উপ-পরিচালক মো. শামসুজ্জামান জানান, সিলেটে ৮৮ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ফসল উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকার প্রায় ৮৫ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে। দ্রুত ধান কেনার জন্য খাদ্য বিভাগে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।