হাওরাঞ্চলে অকাল বৃষ্টির প্রভাবে বিপর্যয় নেমে এসেছে ধান উৎপাদনে। প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে চলতি মৌসুমে চাল উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে চালের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এখনই পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।
স্থানীয়ভাবে পাঁচ বছর পরপর হাওরাঞ্চলে বড় ধরনের অকাল বৃষ্টিপাত ও ঢলের ঘটনা ঘটে, যাকে স্থানীয়রা ‘কাচইরা’ বলে থাকেন। এবারও সেই কাচইরার প্রভাবে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গের পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাওরাঞ্চলে এবার প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে হাওরের ফসলহানি জাতীয় উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এর আগে ২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে অকাল বন্যায় প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়। ওই বছর বাজারে চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরে পাঁচ বছর পর আবারও চৈতালি ঢলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা চালের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
এবারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন কৃষকেরা। তারা জানান, জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে কাঁচা ধান কাটতে হচ্ছে। এতে ফলন কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন খরচও বাড়ছে। অনেক কৃষক সংসার চালানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবারের অকাল বৃষ্টি ও ঢলে প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে হাওর নিয়ে কাজ করা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৮০ হাজার হেক্টর। সংগঠনটির মতে, অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে পানি দ্রুত বের হতে পারেনি, ফলে ফসল ডুবে গেছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, “এবারের বাঁধগুলো ছিল অপরিকল্পিত। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং ফসল নষ্ট হয়েছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু জায়গায় কৃষকরা বাঁধ কাটার চেষ্টা করলেও প্রশাসনিক বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
ধান গবেষণা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান থেকে মানসম্মত চাল উৎপাদন কঠিন হবে। ফলে দেশীয় বাজারে তিন লাখ টন পর্যন্ত চাল ঘাটতির সম্ভাবনা রয়েছে।
ধান বিজ্ঞানী জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, “হাওরাঞ্চলের জন্য ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা জরুরি। কোথায় বেশি পানি আসে, কোথায় ঝুঁকি বেশি—এসব নির্ধারণ করে পরিকল্পিত চাষাবাদ করতে হবে।”
এদিকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে টেকসই ও পরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করছে।