ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

মিরপুরজুড়ে ফুটপাত-গাড়ি, চাঁদাবাজিতে একই কাড়াকাড়ি


ঢাকার মিরপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা চাঁদাবাজির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

  • আপলোড সময় : বুধবার ০৬ মে, ২০২৬ সময় : ১০:৫৯ এএম

অনলাইন রিপোর্টার

ঢাকার মিরপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা চাঁদাবাজির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অনুসন্ধান ও তালিকায় ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর এই এলাকায় দেড় শতাধিক চাঁদাবাজির স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সংগঠিতভাবে দোকান, ফুটপাত, পরিবহন ও বিভিন্ন ব্যবসা খাত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব কার্যক্রমে ৭২ জন সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং অন্তত ২৫ জন ব্যক্তি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালীরাও রয়েছেন।

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত পুরো এলাকা, পাশাপাশি মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, রূপনগর, শাহ আলী ও ভাষানটেক থানার বিভিন্ন অংশে চাঁদাবাজির বিস্তার রয়েছে। রাস্তার দুই পাশে ফুটপাত দখল করে শত শত দোকান বসানো হয়, যেগুলো থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানের অবস্থান ও আকারভেদে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এই টাকা সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা ‘লাইনম্যান’ হিসেবে কাজ করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর সেকশনের এলাকায় প্রায় ১৪০০ থেকে ১৭০০ দোকান ফুটপাত ও সড়ক দখল করে পরিচালিত হচ্ছে। এসব দোকান থেকে দৈনিক গড়ে ২০০ টাকা করে চাঁদা ধরা হলে মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী চক্র এবং কিছু প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুর এলাকার চাঁদাবাজি শুধু ফুটপাত বা হকার মার্কেটেই সীমাবদ্ধ নয়। গাবতলী টার্মিনাল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ, লেগুনা স্ট্যান্ড, ভাঙারি ব্যবসা, বালু ও কয়লা ব্যবসা, ঝুট ও পোশাক কারখানার বর্জ্য ব্যবসা, নির্মাণকাজ, বস্তি, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগসহ বহু খাতে এই চাঁদাবাজি বিস্তৃত। এমনকি সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজার ও অস্থায়ী দোকান থেকেও নিয়মিত অর্থ তোলা হয়।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ তালিকায় বলা হয়েছে, মিরপুর অঞ্চলে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে একটি বড় অংশ স্থানীয় রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি কিছু পেশাদার অপরাধী চক্রও সক্রিয় রয়েছে। তালিকায় কিছু ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ থাকলেও অনেকের পরিচয় স্পষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ রাজধানীতে চাঁদাবাজি শনাক্তে পৃথক একটি তালিকা তৈরি করেছে, যেখানে এক হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। এই তালিকা তৈরিতে থানা পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিট এবং অন্যান্য শাখা একসঙ্গে কাজ করেছে। তালিকায় চাঁদাবাজদের পাশাপাশি আশ্রয়দাতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এসব অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান চলছে এবং ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে।

মিরপুর এলাকার হকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটপাতের দোকানগুলোতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের পর একজন ব্যক্তি এসে টাকা সংগ্রহ করেন। বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতি বাতির জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দোকান বন্ধ থাকলেও আগের দিনের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়। অনেক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, চাঁদা না দিলে দোকান বসাতে দেওয়া হয় না বা ভয়ভীতি দেখানো হয়।

অন্যদিকে, পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর এলাকায় কিছু লেগুনা স্ট্যান্ড ও পরিবহন সেক্টর থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। প্রতিটি যানবাহন থেকে দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়, যা মাসে বড় অঙ্কে পরিণত হয়। এই অর্থ সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কাজ করে, যারা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পল্লবী ও মিরপুরের কিছু এলাকায় আবাসন প্রকল্প, জমি কেনাবেচা এবং নতুন ভবন নির্মাণের সময়ও চাঁদা দাবি করার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো প্রকল্প শুরু হলেই নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী অর্থ দাবি করে এবং না দিলে ভয়ভীতি বা হামলার হুমকি দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। এই অভিযানে চিহ্নিত তালিকাভুক্ত অনেক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, এমনকি বাহিনীর কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চাঁদাবাজি ব্যবস্থা এখন একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধ কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যেখানে স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে। এর ফলে সাধারণ ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান না হলে এই চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা চায়, এই ধরনের অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে স্থায়ী নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশাবাদী, চলমান অভিযান অব্যাহত থাকলে মিরপুরসহ রাজধানীর চাঁদাবাজির এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর