দেশে শিশুদের মধ্যে হামে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে শুধু টিকা না পাওয়া নয়, ভিটামিন এ-এর ঘাটতি, অপুষ্টি, এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়াও বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ মাস বয়সী শিশু মাহাজবির মৃত্যু হয় তিন দিন আইসিইউতে থাকার পর। শিশুটির মা শিউলি আক্তার সন্তানের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ ধরনের ঘটনাই এখন হামে মৃত্যুর সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ছয় শিশুর মৃত্যু এবং নিশ্চিত হামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে ও হামের উপসর্গে ৩৪৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও সময়মতো টিকাদান না হওয়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, শিশুদের টিকাদান, ভিটামিন এ বিতরণ, কৃমিনাশক কর্মসূচি এবং মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রচার—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে, যা অপুষ্টি বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্ট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, ভিটামিন এ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ঘাটতি থাকলে শিশুদের চোখ ও দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের শিশুদের বড় অংশই ভিটামিন এ ঘাটতিতে ভুগছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ১৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতিই হামের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি এবং ২১ শতাংশ আংশিক টিকা পেয়েছে। এতে বোঝা যায়, টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন নিয়মিত না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পাশাপাশি মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হারও কমে গেছে, যা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সর্বশেষ জনমিতি জরিপ অনুযায়ী মাত্র ৫৩ শতাংশ শিশু ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ পায়, যা আগের তুলনায় কম।
শিশুদের কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও নিয়মিত না হওয়ায় অপুষ্টি বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়হীনতার কারণে দেশে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু বাড়ছে, যা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকেত।