রফিকুল ইসলাম রাজু
মা— ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা, নিরাপত্তা, মমতা আর নিঃস্বার্থ ত্যাগের গল্প। একজন সন্তানের জীবনে প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক এবং প্রথম বন্ধুর নাম মা। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের স্বপ্ন, আরাম, সুখ— সবকিছু বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না তিনি। তাই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের বিশেষ দিন হিসেবে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। সেই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস।
বিশ্ব মা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি মায়ের প্রতি হৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশের একটি উপলক্ষ। ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে অনেক সময় প্রিয় মানুষটিকে বলা হয় না— ‘মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ অথচ একজন মা সন্তানের জন্য নির্ঘুম রাত কাটান, নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন, অসুস্থতার সময় পাশে থাকেন এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে সাহস জোগান। তাই এই দিনটি যেন মায়ের প্রতি না বলা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ সুযোগ হয়ে ওঠে।
বিশ্ব মা দিবসের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯০৭ সালে ফিলাডেলফিয়ার আনা জারভিস তার মা আনা রিভস জারভিসের স্মরণে একটি ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। আনা রিভস জারভিস শিশু মৃত্যুহার কমানো এবং মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। মায়েদের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি দিতেই তার মেয়ে আনা জারভিস এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
আনা জারভিস বিশ্বাস করতেন, পরিবার ও সন্তানের জন্য মায়েরা যে অসীম ত্যাগ স্বীকার করেন, তার যথাযথ সম্মান পাওয়া উচিত। তার নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালিত হয়। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে সরকারি মা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বর্তমানে এটি বৈশ্বিক একটি আবেগঘন দিবসে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও প্রতি বছর মা দিবসের গুরুত্ব বাড়ছে। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে দিবসটি এখন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানা আয়োজন করে থাকে। কোথাও আলোচনা সভা, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবার কোথাও মায়েদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
অনেকেই এই দিনে মাকে ফুল, শাড়ি বা ছোট উপহার দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। কেউ মায়ের সঙ্গে সময় কাটান, কেউ তাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যান বা একসঙ্গে খাবার খান। আবার অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার হলো মায়ের পাশে কিছুটা সময় থাকা। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়েরা সন্তানদের সময় ও সঙ্গকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন।
বিশেষ দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও নানা আয়োজন করেছে। ফুড রাইডার প্রতিষ্ঠানগুলো মা দিবস উপলক্ষে বিশেষ ছাড় ও উপহারের ব্যবস্থা করেছে। ডেজার্ট, ফুল ও বিভিন্ন ধরনের উপহারে দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় ছাড়। পাশাপাশি গ্রাহকদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ গিফট হ্যাম্পার জেতার সুযোগও।
এদিকে বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘আলী-রূপা ফাউন্ডেশন’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় অভিনেত্রী ববিতাকে দেওয়া হবে ‘মা পদক ২০২৬’। চলচ্চিত্রে মায়ের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় এবং ব্যক্তিগত জীবনে সন্তানকে সুশিক্ষায় গড়ে তোলার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই সংস্কৃতিমনাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
মা দিবসকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজও এনেছে নতুন আয়োজন। শাড়ি, থ্রি-পিস, ব্যাগ, গহনা ও বিভিন্ন উপহারের বিশেষ সংগ্রহ বাজারে এসেছে। পাশাপাশি মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে অনেক প্রতিষ্ঠান আকর্ষণীয় মগ, ফটো ফ্রেম ও স্মারক সামগ্রী বাজারজাত করছে।
তবে অনেকেই মনে করেন, মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কারণ একজন মা বছরের প্রতিটি দিনই সন্তানের জন্য ভালোবাসা, ত্যাগ ও দায়িত্ব পালন করেন। তাই শুধু মা দিবসে নয়, প্রতিদিনই মায়ের প্রতি সম্মান, যত্ন ও দায়িত্ববোধ দেখানো প্রয়োজন।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক সন্তান কর্মক্ষেত্র বা পড়াশোনার কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকেন। অনেকেই মায়ের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটাতে পারেন না। ফলে মা দিবস যেন সম্পর্কের দূরত্ব কমানোরও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। কেউ ফোনে মায়ের খোঁজ নেন, কেউ ভিডিও কলে কথা বলেন, আবার কেউ দূরে থেকেও উপহার পাঠিয়ে মাকে চমকে দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ের সঙ্গে সন্তানের মানসিক সম্পর্ক একটি মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন মায়ের স্নেহ, শিক্ষা ও মূল্যবোধ সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই পরিবারে মায়ের অবস্থান শুধু আবেগের জায়গা নয়, এটি একটি সমাজ গঠনেরও অন্যতম ভিত্তি।
মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে খুব দামি কিছুর প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন একটু আন্তরিকতা, সময় ও যত্ন। মায়ের পছন্দের খাবার রান্না করা, তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, পুরোনো স্মৃতির ছবি দিয়ে অ্যালবাম তৈরি করা কিংবা সংসারের কাজে সহায়তা করাও হতে পারে ভালোবাসার বিশেষ প্রকাশ। অনেক সময় একটি ছোট্ট আলিঙ্গন বা একটি আন্তরিক বাক্য— ‘মা, তুমি আছ বলেই আমি ভালো আছি’— একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে ওঠে।
বিশ্ব মা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে অনেক সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলালেও ‘মা’ শব্দটি আজও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রতীক। একজন মা কখনও সন্তানের বিনিময়ে কিছু চান না, শুধু চান সন্তানের সুখ ও নিরাপত্তা। তাই মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হোক প্রতিদিনের অভ্যাস— শুধু একটি বিশেষ দিনে নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে।
আকাশজমিন/ আরআর