দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৪১৫ জনে পৌঁছেছে এবং সংক্রমণ ৫৬ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়-দায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা কারও অবহেলা বা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন জাতীয় পর্যায়ের টিকাদান ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা, টিকাদান কার্যক্রমে প্রশাসনিক জটিলতা, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলন এবং ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকার কারণে দেশে হামের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে টিকা কাভারেজে ধীরগতির কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি তৈরি হয়, যা সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা Expanded Programme on Immunization (EPI)–এর মাধ্যমে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চললেও গত কয়েক বছরে ক্যাম্পেইন পর্যায়ে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। ফলে যেসব শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে ছিল, তারা হামের ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
স্বাস্থ্য খাতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হামের টিকা (এমআর টিকা) দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ ছিল। গত বছরের সেপ্টেম্বরেই নতুন টিকা দেশে আসে। তবে টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন, স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং জাতীয় নির্বাচনকালীন পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত ক্যাম্পেইন একাধিকবার পিছিয়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিআই সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, টিকার সরবরাহে কোনো সংকট ছিল না। প্রতি তিন মাস অন্তর চাহিদা অনুযায়ী জেলা পর্যায়ে টিকা পাঠানো হতো। অনেক জেলায় পূর্বের টিকা অব্যবহৃত থাকায় নতুন চাহিদাও কম ছিল। তবে মাঠপর্যায়ে কর্মবিরতি ও আন্দোলনের কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
তাদের মতে, চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে পূর্বনির্ধারিত ক্যাম্পেইন পিছিয়ে যাওয়ায় শিশুদের একটি বড় অংশ টিকার বাইরে থেকে যায়। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতির কারণে দেশব্যাপী অস্থায়ী টিকাকেন্দ্রগুলোতে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুদের একত্রে টিকা দেওয়ার জন্য জাতীয় ক্যাম্পেইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সর্বশেষ বড় ক্যাম্পেইন দীর্ঘ সময় আগে অনুষ্ঠিত হওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়।
ইপিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এমআর১ ও এমআর২ টিকার কভারেজ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওঠানামা করেছে। কিছু বছরে কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা আবার কমে যায়। এই অসম ধারাবাহিকতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ঘাটতি তৈরি করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শুধু টিকা নয়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়েছে। অপুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা ও মৃত্যুহার বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একজন বলেন, “টিকা ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন নিয়মিত না হলে শিশুদের শরীরে যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার কথা, তা বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, নিয়োগবিধি সংশোধন ও টেকনিক্যাল মর্যাদাসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। আন্দোলনের সময় মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল।
তাদের দাবি, কিছু সময় টিকা কার্যক্রম চললেও সেই তথ্য সঠিকভাবে রিপোর্টিং সিস্টেমে যুক্ত হয়নি। ফলে প্রকৃত কভারেজ ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারিভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তাদের দাবি পূরণে ধীরগতি রয়েছে। এ কারণে বারবার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘ বিরতি এবং মাঠপর্যায়ের অস্থিরতা একসঙ্গে মিলেই বর্তমান সংকট তৈরি করেছে। তার মতে, সময়মতো ক্যাম্পেইন হলে এই পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত।
তিনি আরও বলেন, “টিকা মজুদ থাকা সত্ত্বেও সময়মতো ক্যাম্পেইন না হওয়াই বড় সমস্যা। প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এখানে স্পষ্ট।”
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, টিকা গ্রহণের হার কমে গেলে দ্রুত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। কমিটি টিকা সরবরাহ, ক্যাম্পেইন বিলম্ব, মাঠপর্যায়ের কর্মবিরতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে বলে জানা গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আকাশজমিন
/ আরআর