সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও কার্যকর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁরা শুধু নতুন সংস্কার নয়, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের কাজেও মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা সব খারাপ করে আসছি, তা তো না।”
শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) ৫৮তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে বিবিএ, এমবিএ, ইএমবিএ ও ডিবিএ প্রোগ্রামের ৩৬৫ শিক্ষার্থী অংশ নেন।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল গভীর সংকটে। ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার, রাজস্ব প্রশাসনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা বিরাজ করছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, চলতি হিসাব ও সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় নতুন করে বড় সংস্কার বাস্তবায়নের আগে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা জরুরি হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “আমি দুটি শব্দ ব্যবহার করি—রিপেয়ার ও রিফর্ম। প্রথমে আমাদের রিপেয়ার করতে হয়েছে, পরে রিফর্ম।” তাঁর মতে, দেশের অর্থনীতি তখন এমন অবস্থায় ছিল যে আগে সেটিকে ‘খাদের কিনারা’ থেকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে।
সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের অভাব। “আমাদের স্ট্রেন্থ ছিল না, ম্যান্ডেটও ছিল না,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি।
ব্যাংক খাত নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল আইনি কাঠামোর কারণে খাতটি জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে। শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়, এজন্য প্রয়োজন কার্যকর আইন সংস্কার। তিনি বলেন, “খারাপ আইন রেখে ভালো ফল আশা করা যায় না।”
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রসঙ্গেও কথা বলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, এখন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে আগের তুলনায় কম সময়ে অর্থ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। একই সঙ্গে শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
রপ্তানি খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিল্প খাতে প্রণোদনা দেওয়া হলেও অনেক শিল্প এখনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি। “ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি” হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া হলেও অনেক খাত এখনও পরিণত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শুল্ক পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশও সুশাসন, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে এগিয়ে যেতে পারবে।
সমাবর্তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “সৎ উদ্দেশ্য থাকলে পরিবর্তন অনিবার্য।” তিনি নতুন প্রজন্মকে নৈতিক নেতৃত্ব, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ১১৬ জন শিক্ষার্থীকে বিবিবিএ, ১২৬ জনকে এমবিএ, ১২২ জনকে ইএমবিএ এবং একজনকে ডিবিএ ডিগ্রি প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ২৬ জন শিক্ষার্থী ‘ডিরেক্টরস অনার লিস্টে’ স্থান পান এবং দুজন শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক অর্জন করেন।