দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের ওপর গত দেড় বছরে নজিরবিহীন হামলা, মামলা, হুমকি ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সময়ে দুই হাজারের বেশি শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক, নাট্যজন, বাউল, আবৃত্তিশিল্পী ও চলচ্চিত্রকর্মী বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে, কেউ হয়েছেন মব হামলার শিকার, আবার কেউ বাধ্য হয়েছেন আত্মগোপনে যেতে বা দেশ ছাড়তে।
সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের অভিযোগ, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বাউল, সুফি, পালাগান ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।
২০২৫ সালে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে বাউলশিল্পী হালিম উদ্দিন আকন্দকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি জোর করে তাঁর মাথার জট ও দাড়ি কেটে দিচ্ছে। অসহায় এই শিল্পীর আর্তনাদ দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ বাউল সমিতি ও বাংলাদেশ সুফি জাগরণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে সারা দেশে প্রায় দুই হাজার বাউল, পালাকার, বয়াতি ও লোকশিল্পী হামলা, হুমকি ও অনুষ্ঠান বন্ধের শিকার হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাও হয়েছে।
বাংলাদেশ বাউল সমিতির মহাসচিব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, সংগঠন হিসেবেও তাঁরা হামলার শিকার হয়েছেন। অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি। ভয়ভীতি দেখিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জে বাউলদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলার ঘটনা ঘটে। ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে হামলা চালিয়ে কয়েকজন বাউলশিল্পীকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত হন শিল্পী আবদুল আলীম, আরিফুল ইসলাম ও জহিরুল ইসলাম। একই বছরের ২৬ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও শহরে বাউলশিল্পীদের প্রতিবাদ সমাবেশেও হামলার অভিযোগ ওঠে।
লোকসংস্কৃতি গবেষক আমিনুর রহমান সুলতান বলেন, বাউল, পালাগান ও মাজারকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধারার ওপর আঘাত দেশের সহিষ্ণু সাংস্কৃতিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।
শুধু লোকসংস্কৃতিই নয়, নাট্যাঙ্গনও ছিল চাপে। নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করতেই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।
নাট্যকার ও নির্দেশক মামুনুর রশীদও হামলা ও হেনস্তার শিকার হন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শিল্পকলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যের সময় ডিম নিক্ষেপ ও হামলার ঘটনা ঘটে। পরে তাঁকে নাটকে অভিনয় না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
চলচ্চিত্র অঙ্গনের তারকারাও রেহাই পাননি। অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে হত্যা চেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে প্রকাশ্যে মারধর ও লাঞ্ছনার পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এ ছাড়া শতাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক ও প্রযোজকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফেরদৌস আহমেদ, রিয়াজ, চঞ্চল চৌধুরী, অপু বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, মেহের আফরোজ শাওন, সোহানা সাবা, জাকিয়া মুন, জ্যোতিকা জ্যোতি, সুবর্ণা মুস্তাফা, আজিজুল হাকিমসহ আরও অনেকে।
চারুকলা অঙ্গনেও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন নবীকে একটি অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার শঙ্কায় দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। ভাস্কর রাসাও রাজধানীর গুলশানে প্রকাশ্যে হেনস্তার শিকার হন।
আবৃত্তিশিল্পী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারাও ছিলেন হামলা ও মামলার শিকার। জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান। তাঁর দাবি, শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে টার্গেট করা হয়েছে।
কবি-সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধেও মামলা ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কবি-সাহিত্যিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে গুরুতর আহত হন কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব। পরে দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
কবি কুতুব হিলালী অভিযোগ করেন, তাঁদের ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
এদিকে প্রকাশক, লেখক ও শিক্ষাবিদদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়। কবি ও প্রাবন্ধিক সোহেল হাসান গালিব ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। প্রকাশক হুমায়ুন কবীর জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছবি থাকা এবং তাঁর বই প্রকাশের কারণেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের অভিযোগ, সংগঠিতভাবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত, ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ‘তৌহিদী জনতা’ নাম ব্যবহার করে অনেক হামলা পরিচালিত হয়েছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ মনে করেন, শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের ওপর হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরিকল্পিত। তাঁর মতে, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো সংস্কৃতিচর্চাকে দুর্বল করতে ভয় ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করেছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, সংস্কৃতি সবসময় মানবিকতা, সহনশীলতা ও মুক্তচিন্তার চর্চা করে। আর সেই জায়গাটিকেই আঘাত করা হয়েছে।
শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, মতভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক চর্চাকে দমন করার মাধ্যমে সমাজে ভয় ও অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁরা অবাধ সংস্কৃতি চর্চার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।