রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জীবন চরম বৈষম্য ও কষ্টে কাটছে। দিনভর রিকশা ভ্যানে করে দুর্গন্ধময় ময়লা টেনে যারা শহর পরিচ্ছন্ন রাখছেন, মাস শেষে তাদের পকেট থাকছে শূন্য কিংবা নামমাত্র বেতনে কোনোমতে চলছে সংসার। অথচ তাদের হাড়ভাঙা খাটুনিকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকার ‘ময়লা-বাণিজ্য’ ফেঁদে পকেট ভরছেন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা।
রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কের পাশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন রুবেল ও সাইদুর নামের দুই তরুণ-কিশোর। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৯-১০ ঘণ্টা নোংরা আবর্জনা ঘেঁটে রুবেল বেতন পান ১৩ হাজার টাকা এবং কিশোর সাইদুর পায় ১০ হাজার টাকা। রুবেল জানান, মাস শেষে এই টাকায় ঢাকা শহরে থাকা-খাওয়ার খরচ পোষায় না। বেতনের পাশাপাশি ময়লার ভেতর থেকে কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিক, কাগজ বা ভাঙারি পণ্য বিক্রি করে মাসে তাদের আরও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়, যা তারা দুজনে ভাগ করে নেন। প্রতি কেজি ভাঙারি পণ্য ২২ টাকা দরে বিক্রি হয় এবং একটি ভ্যান থেকে দিনে গড়ে ১০ কেজির মতো ভাঙারি পাওয়া যায়।
শুধু রুবেল-সাইদুরই নন, ঢাকার বেশির ভাগ এলাকার ভ্যান সার্ভিস কর্মীদের বেতন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় চিত্রটি আরও ভয়াবহ। সেখানকার বেশির ভাগ ভ্যান কর্মীর কোনো মাসিক বেতনই নেই। গুলশানের ৯১-৯২ নম্বর সড়কে কাজ করা নয়ন মিয়া জানান, তারা চার ভাই ভ্যান চালান এবং তাদের ১২ বছর বয়সী ছোট ভাই ফরিদ ভাঙারি বাছতে সাহায্য করে। বেতন না থাকায় মানুষের বাসাবাড়ির ময়লা থেকে পাওয়া ভাঙারি দিনে ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করে যা পান, তা দিয়েই তাদের চলতে হয়। বনানী ও গুলশানের অন্য কর্মী কাউসার, মিস্টন ও আশরাফুলেরও একই দশা। অন্যদিকে উত্তর সিটির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের আইনুসবাগ এলাকায় ভাইবোন মোশাহিদ ও জুলেখা মিলে ২৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। আবার কোথাও ১৭ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হলেও শর্ত থাকে যে, ভাঙারি পণ্যের সব টাকা মালিককে দিয়ে দিতে হবে।
শ্রমিকদের এই কষ্টের বিপরীতে ময়লা-বাণিজ্যে উড়ছে কোটি কোটি টাকা। উদাহরণস্বরূপ, বনানী এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ময়লার বিল নেওয়া হয়, যেখান থেকে মাসে আদায় হয় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। নিয়মানুযায়ী এই বিল সর্বোচ্চ ১০০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও নগরবাসীকে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণে ৭৫টি এবং উত্তরে ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। দক্ষিণ সিটিতে দরপত্রের নিয়ম থাকলেও মূলত ক্ষমতার প্রভাবে পুরো বর্জ্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও নেতারা, আর এখন তা নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী।
এই চরম অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি বর্জ্য কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও ভয়াবহ। নিয়মানুযায়ী মাস্ক, গামবুট, হাতমোজা এবং ভ্যানে ত্রিপল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া এ বিষয়ে তদারকির অভাব স্বীকার করে বলেন, ভবিষ্যতে এসব শর্ত মানতে ভ্যান সার্ভিসগুলোকে বাধ্য করার চেষ্টা করা হবে।