ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

আন্তর্জাতিক চা দিবস

চায়ের কাপে সুখ মেশানো মানুষগুলোর নিজের জীবনই বিষাদে ভরা


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২১ মে, ২০২৬ সময় : ৯:৪৪ এএম

‘দুটি পাতার একটি কুঁড়ি’—এই চেনা কথাটি শুনলেই যেকোনো মানুষের চোখের সামনে এক মুহূর্তেই ভেসে ওঠে পাহাড়ঘেরা অপরূপ সবুজ চা বাগান, আঁকাবাঁকা টিলা আর প্রকৃতির এক মোহময় অনাবিল সৌন্দর্য। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা সারাদিনের ক্লান্তি আর কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এক কাপ গরম চা আমাদের মনের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়, এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। কিন্তু সেই চায়ের কাপে প্রতিদিন সুখানুভূতি মেশানো মানুষগুলোর নিজের জীবন ঠিক কতটা বিষাদে ভরা, বঞ্চনাময় আর অন্ধকারাচ্ছন্ন—তা খুব কম মানুষই গভীরভাবে ভেবে দেখেন। সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে যারা এই অমৃতের সন্ধান দেন, তাদের জীবনটাই যেন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।

আঠারো শতকে এই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামের মাটিতে। শত বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, সময়ের বিবর্তনে পৃথিবী বদলেছে এবং বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রার সামগ্রিক মান। অথচ চট্টগ্রামের ফটিকছড়িসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চা শ্রমিকদের জীবন যেন এখনও আটকে আছে সেই প্রাচীন সাদাকালো এক নির্মম বাস্তবতায়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক সময়ে শ্রমের মজুরি বাড়েনি, নিশ্চিত হয়নি তাদের সন্তানদের ন্যূনতম শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কিংবা একটু নিরাপদ বাসস্থান। অধিকাংশ বাগানেই নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং নিশ্চিত করা যায়নি নারী ও শিশুদের নুন্যতম সামাজিক নিরাপত্তা। তারা যেন আধুনিকতার এই আলো ঝলমলে সময়েও এক চির অন্ধকারে পড়ে থাকা আদিম জনপদ।

বর্তমানে দৈনিক মাত্র ১৭৮ টাকা নগদ মজুরিতে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামসহ সারা দেশের চা বাগানের লাখো শ্রমিক। বর্তমান বাজারের লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে, যেখানে মাত্র দুই কেজি চাল কিনতেই এই দৈনিক আয়ের পুরো টাকা শেষ হয়ে যায় এবং অন্য সবকিছুর জন্য হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই সামান্য আয়ে একটি পুরো পরিবার চালানো অনেকের কাছেই পুরোপুরি অসম্ভব ও অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে। আজ ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস। বিশ্বজুড়ে চায়ের ঐতিহ্য নিয়ে নানা আয়োজন করা হলেও, এসব জাঁকজমকপূর্ণ দিবস আসলে কোনো পরিবর্তনই নিয়ে আসে না এই হতভাগ্য চা শ্রমিকদের বাস্তব জীবনে। এই চা শ্রমিকদের অধিকাংশেরই এখানে বসবাস ও কাজ বংশপরম্পরায়। তারা গভীর আক্ষেপ নিয়ে মনে করেন, চায়ের গাছ যেভাবে ছেঁটে রাখার কারণে সাধারণত ২৬ ইঞ্চির পর আর ওপরের দিকে বড় হয় না, ঠিক তেমনি তাদের জীবন ও ভাগ্যও যেন ওই চা গাছের মতোই ২৬ ইঞ্চিতে আটকে গেছে, যার আর কোনোদিন কোনো পরিবর্তন বা উন্নতি হয় না।

তীব্র রোদে পুড়ে এবং অনবরত বৃষ্টিতে ভিজে যারা প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ‘একটি কুঁড়ি আর দুটি পাতা’ পরম যত্নে সংগ্রহ করে মানুষের শৌখিন চায়ের কাপ ভরিয়ে তোলেন, তাদের বুকের ভেতরের জীবনযন্ত্রণা ও যাতনা কতটা গভীর—সেই করুণ গল্প জানতেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে এই শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবন সংগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করা হয়।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা বাগানের একজন সাধারণ নারী শ্রমিক তাহেরা বেগম তার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘সারাদিন তীব্র রোদে পুড়ে এবং কখনো মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে কাজ করি। দিন শেষে আমাদের হাতে মাত্র ১৭৮ টাকা দেওয়া হয়। কোনো কারণে একদিন কাজ করতে না পারলে সেই সামান্য টাকাও আর মেলে না। বর্তমান বাজারের যে অবস্থা, এই যৎসামান্য টাকায় এখন কীভাবে আমাদের সংসার চলবে, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।’

একই বাগানের ৯ নম্বর সেক্টরের আরেকজন শ্রমিক হনুফা বেগম বলেন, ‘আমাদের অনেক পরিবারে পাঁচ থেকে ছয়জন করে সদস্য রয়েছে। অথচ পুরো পরিবারে মাত্র একজন মানুষের এই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয় সবাইকে। ভাঙাচোরা ছোট একটা ঘরের মধ্যে গবাদিপশু আর সন্তানদের নিয়ে আমাদের একসাথে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। বাগান কর্তৃপক্ষকে ঘর মেরামতের কথা বারবার বললেও বছরের পর বছর কেটে যায়, কিন্তু তা আর মেরামত হয় না। সবচেয়ে বড় ভয় হলো, কোনো কারণে এই কাজটা হারালে আমাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও আর থাকবে না।’

সাধারণ শ্রমিক এবং বাগান পঞ্চায়েত নেতাদের সরাসরি অভিযোগ, অধিকাংশ চা বাগানেই মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সাধারণ মৌলিক অধিকারগুলো ন্যূনতম নিশ্চিত করে না। শিক্ষা ও চিকিৎসার চরম ঘাটতির পাশাপাশি দেশের প্রচলিত শ্রম আইন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির নানা শর্তও যথাযথভাবে মানা হয় না।

এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন কর্ণফুলী চা বাগানের একজন শ্রমিক কৃষ্ণ মনি। তার প্রতিদিনের জীবনও কাটে ঠিক একইভাবে চরম বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটানা বিরতিহীনভাবে মাঠে কাজ করেন তিনি। কাজের চাপে দুপুরে শান্তিতে একটু খেতে যাওয়ারও সময় পান না। দিন শেষে তার ভাগ্যেও মেলে মাত্র ১৭৮ টাকা। কৃষ্ণ মনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা যারা বাগানের সীমানার বাইরে পরিবার নিয়ে কষ্ট করে থাকি, তাদের ঘরভাড়া ও অন্যান্য খরচের কারণে আরও বেশি কষ্ট করতে হয়। আমরা গরিব বলেই এই অল্প টাকায় এত খাটাখাটুনির কাজ করি। কোনোভাবে টেনেটুনে শুধু সংসারটা টিকে আছে।’

বৈলগাঁও চা বাগানের অঞ্জনি ত্রিপুরা নামের আরেক নারী শ্রমিক নিজের জীবনের চরম কষ্টের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে চোখের জল আর সামলাতে পারেননি। তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘এত কম বেতনে এই বাজারে পরিবার চালানো যে কতটা কঠিন, তা শুধু আমরাই জানি। সামনে আবার ঝড়-বৃষ্টির দিন আসছে। কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ আমাদের সুরক্ষার জন্য এখনও পর্যন্ত একটি ভালো রেইনকোটও দেয়নি। শুধু একটা পাতলা প্লাস্টিক দেয় গা ঢাকতে, বাতাস আর বৃষ্টিতে তাও উড়ে যায় এবং শরীর সম্পূর্ণ ভিজে যায়। অসুস্থ হলেও ছুটি মেলে না।’

চা বাগানের পঞ্চায়েত নেতা মৃদুল কর্মকার শ্রমিকদের পক্ষে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই চা শ্রমিকদের অক্লান্ত শ্রম আর গায়ের ঘাম রক্তে মিশে আজ এই বিশাল চা শিল্পের এত বড় প্রসার ঘটেছে এবং মালিকদের লাভ হয়েছে। কিন্তু যারা মূল কারিগর, তাদের জীবনে বঞ্চনা আর চরম দারিদ্র্যের কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি। চারদিকে দেশের এত উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও, এই চা শ্রমিকদের জীবনমানের কোনো বাস্তব উন্নতি আমাদের চোখে পড়ে না।’

সাধারণ চা শ্রমিকরা জানান, বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বংশপরম্পরায় তারা এই একই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তাদের এই হাড়ভাঙা শ্রম আর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চা শিল্পের ব্যাপক প্রসার ও বিপুল মুনাফা হলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে কখনোই বদলায়নি তাদের ভাগ্য। দীর্ঘ সময় অমানুষিক পরিশ্রম করেও তারা যে নামমাত্র দৈনিক মজুরি পান, তা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল-ডাল কেনার খরচ মেটানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সুপেয় বিশুদ্ধ পানি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক মানবিক সুবিধা থেকেও তারা আজ পুরোপুরি বঞ্চিত।

জাতিসংঘের স্বীকৃতি অনুযায়ী প্রতি বছর ২১ মে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে চা শিল্পের সার্বিক টেকসই উন্নয়ন, চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা এবং চায়ের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতেই মূলত এই আন্তর্জাতিক চা দিবস পালন করা হয়। প্রথমদিকে বিশ্বের বিভিন্ন চা উৎপাদনকারী দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের মতো করে এই দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ মে তারিখটিকে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে সর্বসম্মত ঘোষণা করে। এরপর থেকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে এই বিশেষ দিবসটির সার্বিক সমন্বয় করে আসছে।

সবুজ চা বাগানের মায়াবী সৌন্দর্যের আড়ালে প্রতিদিন সযত্নে লুকিয়ে থাকে হাজারো শ্রমিক পরিবারের বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস, আজীবন বঞ্চনা আর এক চরম অনিশ্চয়তার গল্প। আন্তর্জাতিক চা দিবসে যখন চায়ের ঐতিহ্য, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও শত কোটি টাকার ব্যবসার কথা বলা হয়, তখন বিশ্বমঞ্চে এবং দেশের নীতিমালায় এই অসহায় চা শ্রমিকদের মানবিক জীবন, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জোর দাবিটিও প্রতি বছরের মতো নতুন করে সবার সামনে এসে দাঁড়ায়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর