অনলাইন রিপোর্টার
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৭ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর আয়তনের এই বিশাল আবাসিক এলাকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এত দিন ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের হাতেই ছিল। ফলে অনেকেই এলাকাটিকে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন। তবে সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে এলাকাটিতে দীর্ঘদিনের একক রাজত্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অন্তত ১৫ জন জমির মালিক, ফ্ল্যাটমালিক, ভাড়াটে, আবাসন ব্যবসায়ী, জমির ক্রেতা এবং কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে সম্পূর্ণ নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম তৈরি করে শাসন চালাত বসুন্ধরা গ্রুপ। এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। এলাকাটিতে ব্যক্তিমালিকের কাছ থেকে কেউ জমি বা প্লট কিনলে বসুন্ধরা গ্রুপের আবাসন কোম্পানিকে কাঠাপ্রতি ৫ লাখ টাকা বাড়তি ফি দিতে হয়, যা জমির প্রকৃত দাম ও সরকার নির্ধারিত করের সম্পূর্ণ বাইরে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আগে এই অন্যায্য ফির পরিমাণ ছিল কাঠাপ্রতি ১০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া বসুন্ধরার ‘অনুগত’ হিসেবে পরিচিত মালিক সমিতি ‘বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ প্রতি মাসে ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের সার্ভিস চার্জ আদায় করে থাকে। একটি নোটিশে দেখা গেছে, নিজের ফ্ল্যাটে নিজে থাকলে মাসে বর্গফুটপ্রতি ৬০ পয়সা, ভাড়াটে থাকলে ৮০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য ১ টাকা ৮০ পয়সা হারে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। ফলে দেড় হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মালিককে বছরে প্রায় ১১ হাজার টাকা এবং ভাড়াটে থাকলে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টাকা দিতে হয়।
এই বিশাল এলাকায় গ্রুপটির নিজস্ব একচেটিয়া নিরাপত্তাকর্মী বাহিনী রয়েছে। এতদিন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এই এলাকা থেকে কোনো গৃহকর বা হোল্ডিং ট্যাক্স নিতে পারত না। এমনকি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খেলার মাঠসহ কোনো নাগরিক সুবিধাদির নিয়ন্ত্রণও সিটি করপোরেশনের হাতে ছিল না। ২০১৬ সালের ২৮ জুন এই আবাসিক এলাকাকে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করে সরকারি গেজেট প্রকাশিত হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেখানে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই এলাকাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার জোরদার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি শীর্ষ সূত্র বলছে, গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেন। এরপর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। সর্বশেষ ৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয় এবং ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ-সংক্রান্ত নথি অনুমোদন করেন।
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এলাকাটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে এলে বসুন্ধরা গ্রুপ অথবা বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি জমি ও ফ্ল্যাটমালিক এবং বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূত কোনো টাকা বা বাড়তি ফি নিতে পারবে না। মালিকেরা শুধুমাত্র সরকার-নির্ধারিত ন্যায্য গৃহকর দেবেন এবং সমস্ত নাগরিক সেবা দেবে সিটি করপোরেশন। সেখানে পুলিশের পৃথক থানা স্থাপন করা হবে এবং খেলার মাঠসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার আব্দুল বারী এই বিষয়ে জানান, গ্রুপের কর্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং তারা এই সিদ্ধান্তটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তা শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অবস্থান জানানো হবে। কাঠাপ্রতি বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়ে তাদের দাবি, রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, সড়কবাতি, বৃক্ষরোপণসহ রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য কিছু টাকা নেওয়া হয়, তবে তা খুব বেশি নয়।
তারা আরও দাবি করেন, রাজউকের সঙ্গে তাদের একটি সমঝোতা চুক্তি রয়েছে যার অধীনে ২০৩৪ সালে এলাকাটি হস্তান্তর করার কথা। তবে রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম এই দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলেন, "আমার জানামতে এ ধরনের কোনো চুক্তি রাজউকের সঙ্গে হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কারণ, এটা সিটি করপোরেশনের বিষয়। আমরা তাদের দুবার চিঠি দিয়েছি যেন এটা সিটি করপোরেশনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।"
বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা (২০০৪) অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন শেষ করে তা সরকারি সংস্থার কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর বসুন্ধরাকে প্রথম লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এরপর তারা বারবার সংশোধিত লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন করে সময়ক্ষেপণ করেছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মনে করছেন, আবারও সময় চাওয়া বসুন্ধরার একটি কৌশল মাত্র। এলাকাটি তাদের আয়ের একটি বিশাল উৎস হওয়ায় তারা নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে চায় না। আবাসিক এলাকাটিতে নির্মাণকাজে বসুন্ধরার নির্মাণসামগ্রী এবং রান্নার জন্য তাদের কোম্পানির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারে বাধ্য করার পাশাপাশি ইন্টারনেট, ডিশ ও সুপারশপের ব্যবসাও তারা নিয়ন্ত্রণ করে।
কালের কণ্ঠের একটি বিজ্ঞাপনী ভিডিও তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে ৪টি ব্লক দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে এখন ব্লকের সংখ্যা ২০টি এবং সেখানে ৫০ হাজারের বেশি পরিবারের প্রায় ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। প্রকল্পের আওতা বাড়াতে বসুন্ধরার বিরুদ্ধে অতীতে পেশি ও অর্থশক্তি ব্যবহারের বহু অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান আন্দোলনকারীদের 'সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাহিনী' আখ্যা দিয়ে তাদের ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আমৃত্যু আস্থার কথা বলেছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আহমেদ আকবর সোবহান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর আদালত আহমেদ আকবর সোবহান, তাঁর স্ত্রী আফরোজা বেগম, ছেলে সায়েম সোবহান আনভীর ও তাঁর স্ত্রী সাবরিনা সোবহানসহ পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন। গত ২৭ এপ্রিল আদালতের মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ তাঁদের বিদেশযাত্রার আবেদনও নাকচ করে দেন। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে দুটি মামলার তদন্ত চলছে।
এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ মনে করেন বসুন্ধরা পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ হলেও অনেকেই নিরাপত্তার নামে বাড়াবাড়ি ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। গত ৩১ ডিসেম্বর এই এলাকাতেই নাঈম কিবরিয়া নামের এক আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাসিন্দাদের অভিযোগ, লাইসেন্স ছাড়া অনেক তরুণ-তরুণী এখানে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকপক্ষের কেউ বের হলে সাধারণ মানুষের রাস্তা আটকে ‘ভিভিআইপি’ প্রটোকল দেওয়া হয়।
বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির বর্তমান সভাপতি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল (যিনি বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন) দাবি করেন, "বসুন্ধরায় মানুষ দরজা খুলে ঘুমাতে পারে, সিটি করপোরেশনের অধীনে গেলে এই সৌন্দর্য থাকবে না।" তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, "বসুন্ধরার বক্তব্য তাদের নিজস্ব। দীর্ঘদিন তারা এলাকাটি নিজেদের মতো চালিয়েছে।
তবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে পরিবেশবান্ধব রেখেই সিটি করপোরেশন আগামী দিনে সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে।" নগর-পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, "রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র থাকতে পারে না। এত দিন এই এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতার বাইরে থাকাই ছিল আইনের পরিপন্থী। সরকারের এই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক।"